• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 24 September, 2026

শিক্ষা ও শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ

সমাজ বা দেশের অগ্রগতি অবনতি শিক্ষা ব‍্যবস্থার সঙ্গে সমানুপাতিক। ফেস্টুন প্ল্যাকার্ড নিয়ে ‘শিক্ষা বাঁচাও’ আন্দোলন‍ দেখেছি প্রচুর।

শিক্ষা ও শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ

সমাজ বা দেশের অগ্রগতি অবনতি শিক্ষা ব‍্যবস্থার সঙ্গে সমানুপাতিক। ফেস্টুন প্ল্যাকার্ড নিয়ে ‘শিক্ষা বাঁচাও’ আন্দোলন‍ দেখেছি প্রচুর। শিক্ষা কিন্তু মরেনি, বেঁচে আছে। মানে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। কথাটা শুনতে ভ্রূ কুঁচকে গেলেও বাস্তব চিত্রটা ভীষণ করুণ। শিক্ষা ব‍্যবস্থাপনার শুরুর এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল প্রাথমিক বিভাগ, যে স্তরে শিশুর উচ্চতর শিক্ষা এবং মানসিক ও সামাজিক মূল‍্যবোধের ভিত গড়ে ওঠে। অথচ সেই ভিতটাই ভীষণরকম নড়বড়ে। দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ। স্কুলগুলো শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে। বেশিরভাগ স্কুলে একজন শিক্ষককে একসঙ্গে দুটি বা তিনটি ক্লাস কখনও বা পুরো স্কুলটাই সামলাতে হয়। এই রকম কঠিন পরিস্থিতিতেও সরকারি নির্দেশিকার বাহুল্যের খামতি নেই। দিন শুরু হয় সকালে মিড-ডে-মিলের বাজার করা দিয়ে। কোনদিন কী রান্না হবে, তার ব‍্যবস্থা করা। তেল নুন চাল ডাল আলু পেঁয়াজের হিসাব রাখা। তিথিভোজনের ব‍্যবস্থা করা। সময়মতো মেসেজ পাঠানো। প্রতিদিন তিনরকমের রেজিস্টার মেইনটেইন করা। এতকিছু করার পরেও ঝুলতে থাকে ‘চোর’ বদনামের খাঁড়া। মিড-ডে-মিল সামলাতেই শিক্ষকদের হিমশিম অবস্থা। তবে সুখবর এই যে, এই বিষয়ে বর্তমান সরকার বিষয়টি অনুধাবন করে মিড-ডে-মিল প্রকল্পটি কোন সংস্থার মাধ‍্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ‍্যজুড়ে সমস্ত বিদ‍্যালয়ে এটা চালু হলে শিক্ষকরা অন্তত কিঞ্চিৎ হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।
বিদ‍্যালয়ে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ অবশ‍্য‍ই দরকার। মনীষী মহাপুরুষদের জীবনী ও বাণী আলোচনার মাধ‍্যমে ছাত্রছাত্রীদের মধ‍্যে মূল‍্যবোধ দেশপ্রেমের আদর্শ গড়ে ওঠে। খেলাধূলার‍ও সুযোগ করে দিতে হয়। পঠনপাঠনের এগুলোও অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব যত্ন নিতে আয়োজন করতে হয়। আয়োজন করার সময় জিওট‍্যাগিং ফটো তুলে নির্দিষ্ট ফর্মাটে দপ্তরে পাঠাতেও হয়। পাঠনপাঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ব‍ই খাতা ব‍্যাগ জুতো ইউনিফর্ম দেওয়ার ব‍্যবস্থাও করতে হয় শিক্ষকদের‍ই। এসব নিত্যনৈমিত্তিক কাজের মধ‍্যেই পড়ে। কিন্তু এসবের মধ‍্যেও কখনও কখনও এসে পড়ে জরুরি ভিত্তিতে মিটিংয়ের লিংক অথবা গুগল শীট, যেগুলো তাৎক্ষণিক পূরণ করে দিতে হয়। এর জন্য মোবাইলে নজর রাখতে হয় কখন কোন মুহূর্তে নতুন অর্ডার চলে আসে। সতর্ক থাকতে হয়।
শিক্ষকরা কোনও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নন। স্কুলে কম্পিউটার‍ এবং ওয়াইফাই কানেকশন‍ও নেই। অথচ সমস্ত বিদ‍্যালয়ে অনলাইন কাজ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। অনলাইন অ্যাডমিশন, ট্রান্সফার থেকে শুরু করে মূল‍্যায়নের টোটাল ইভ্যাল‍্যুয়েশনের অনলাইন আপডেট। আগে ছিল বাংলার শিক্ষা ই-পোর্টাল, এস-এম-এস পোর্টাল, এখন হয়েছে জাতীয় স্তরে U-Dise+ পোর্টাল। এখানে নতুন করে স্টুডেন্ট এন্ট্রি, স্টুডেন্টদের GP, EP, FP  প্রোফাইল তৈরি। টিচার প্রোফাইল আপডেট। নতুন করে এসেছে স্টুডেন্টদের আপার আইডি তৈরি। ইকোক্লাব রেজিস্ট্রেশন, প্রোগ্রাম আপডেট, এস-এইচ-ভি-আর রেজিস্ট্রেশন ও ডাটা সাবমিট, ই-বিদ‍্যা অ্যাপ রেজিস্ট্রেশন এরকম নানান কর্মকাণ্ড সারাবছর একের পর এক নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতেই থাকে।
এ তো গেল স্কুলের বিষয়। নিজেদের আপডেট করার জন্য বাধ‍্যতামূলক প্রতিবছর মিনিমাম ৫০ ঘন্টা নিষ্ঠা কোর্স, প্রশস্ত কোর্স করতে হবে। সবথেকে বড় এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো এতোকিছুর পরেও সেই শিক্ষকদের ঘাড়েই চাপানো হল বি-এল-ও ডিউটি, এস-আই-আর ডিউটি, ইলেকশন ডিউটি এবং সেনসাস ডিউটি! মাঝে মাঝে মনে হয়, শিক্ষকরা বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষকরা বোধহয় অন‍্যগ্রহের জীব! তা না হলে হয়তো এত বৃহ‍ৎ কর্মকাণ্ড সামলানো সম্ভব হতো না। এই অদ্ভুত পরিমণ্ডলে শিক্ষা সত‍্যিই যে মহার্ঘ‍ বস্তু হয়ে উঠেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব ছেলেমেয়েদের পড়ানো। তা না করে কচিকাঁচা এবং অভিভাবকদের কাছে শিক্ষকদের অপরাধী বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে বন্ধ হোক এই অনৈতিক লুকোচুরি। সমস্ত অভিভাবক চান তাঁদের সন্তান বিদ‍্যালয়ে গিয়ে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। শিক্ষককুল‍ও চান পাঠদানে মনোনিবেশ করতে। দুইয়ের মাঝে পাহাড়সম অন্তরায় অন‍্যান‍্য ডিউটি, হাজারো সরকারি কর্মকাণ্ড ও নির্দেশিকা। প্রধান শিক্ষকেরা বুঝে উঠে পারছেন না কোনদিক সামলাবেন, কীভাবে সামলাবেন। ফলত শিক্ষা হয়ে উঠেছে দিশেহারা। সরকারি স্কুলে কমছে ছাত্রসংখ‍্যা।
নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক প্রত‍্যাশা। অনেক হয়েছে এবার অন্তত শিক্ষা ব‍্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হোক। শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে ফিরতে  দেওয়া হোক। শিক্ষকরা যেন পাঠদানে‍ই মনোনিবেশ করতে পারেন। সেই নৈতিক কর্তব‍্য থেকে তাঁদের যেন আর বঞ্চিত না করা হয়। গমগমিয়ে উঠুক ক্লাসরুম, শিক্ষাপ্রাঙ্গণ। উন্নয়ন শুধুমাত্র লক্ষ্মীর ভান্ডার, অন্নপূর্ণা ভান্ডার বা নানাবিধ ভাতার উৎসব করে হয় না। শিল্প যেমন দরকার, তেমন দরকার প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশ। যতদিন তা না হচ্ছে, প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। তবে সরকার চাইলে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতেই পারে। সরকারের পক্ষ থেকে যে ব‍্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মনে হয়েছে তা এই রকম, প্রথমত প্রতিটি বিদ‍্যালয়ে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে শ্রেণি-শিক্ষকের ব‍্যবস্থা করা। মিড-ডে মিল প্রকল্প থেকে শিক্ষকদের অব‍্যাহতি দিতে হবে। দরকার সিলেবাসের আমূল পরিবর্তন, প্রতি স্কুলে কম্পিউটার ও গ্রুপ-ডি কর্মী নিয়োগ, শিক্ষকদের পঠনপাঠন ব‍্যতীত অন‍্য সকল ক্রিয়াকলাপ থেকে অব‍্যাহতি, যা শিক্ষা অধিকার আইনের মধ‍্যেই পড়ে। প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাহলেই শিক্ষা ব‍্যবস্থা তার স্বগরিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, এ কথা হলফ করে বলাই যায়। নতুন সরকার শিক্ষা ব‍্যবস্থা উন্নয়নের নানান দিক নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা যে করছে, তা নানান ব‍্যক্তব‍্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা দ্রুত সম্ভব যথাযথ কার্যকর করা দরকার।
এ তো গেল একটা দিক। অন‍্যদিকটি আরও আতঙ্কের— যা সারা দেশের শিক্ষা ব‍্যবস্থাকে এবং প্রফেশনালি শিক্ষকদের খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে দেশের সমস্ত প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক, মাধ‍্যমিক বিদ‍্যালয়ের সাধারণ বিভাগের শিক্ষকদের ৩১ আগস্ট ২০২৮-এর মধ‍্যে টেট উত্তীর্ণ হতে হবে। অন‍্যথায় স্বেচ্ছাবসরে যেতে হবে। অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষাদপ্তর থেকে সুপ্রিম কোর্টের সেই নির্দেশনামাকে মান‍্যতা দিয়ে এই বিষয়ে একটি নোটিফিকেশন জারি করা হয়েছে। ২০০৯ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসারে সমস্ত শিক্ষকদের টেট উত্তীর্ণ হতে হবে। প্রশ্ন হলো— নিয়ম যখন ছিল তখন আমাদের রাজ‍্য তো বটেই, কোনও রাজ‍্য‍ই তা মানল না কেন? অর্থাৎ বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য প্রতিটি রাজ‍্য সরকার দায়ভার এড়াতে পারে না। দ্বিতীয়ত নিয়মটা তৈরি হ‍ওয়ার আগে নিযুক্ত শিক্ষকদের‍ও টেট উত্তীর্ণ বাধ‍্যতামূলক করা হয়েছে। এ কেমন বিচার? জানি না শিক্ষার ভবিষ্যৎ কী! কেন্দ্র সরকার চাইলে নতুন অর্ডিন্যান্স এনে নিমেষে এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে একের পর এক নিয়োগ দুর্নীতি, বাধ‍্যতামূলক টেট শিক্ষক সমাজকে ধীরে ধীরে যেভাবে অসম্মান ও আতঙ্কের ঘেরাটোপে আটকে ফেলা হচ্ছে. তা থেকে আদৌ মুক্তি মিলবে কি? নাকি এ কোনও অশনিসংকেত!