• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 1 October, 2026

নাবালক ও সমাজমাধ্যমের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

আরও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। নাবালকদের সমাজমাধ্যম-ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত যদি নেওয়া হয়, তার প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন কীভাবে হবে? বয়স যাচাইয়ের নামে শিশুদের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হলে আবার গোপনীয়তার সমস্যা দেখা দিতে পারে। মিথ্যা জন্মতারিখ দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রবণতা ঠেকানোও সহজ নয়। ফলে কেবল নিয়ম তৈরি করলেই হবে না, সেই নিয়ম বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং নিরাপদ, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

নাবালক ও সমাজমাধ্যমের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

Photo: Magnific

সমাজমাধ্যম এখন আর নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়। শিক্ষা, তথ্য, মতামত, সামাজিক যোগাযোগ— জীবনের নানা ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ফলে শিশু-কিশোরদের সমাজমাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনই রয়েছে তাদের অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল উপস্থিতির বিপদ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে নাবালকদের সমাজমাধ্যম-অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ‘জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন অ্যালায়েন্স’-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কেন্দ্রের কাছে নাবালকদের জন্য আরও স্পষ্ট আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। আদালতের আলোচনায় উঠে এসেছে, ভারতে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত একজন ব্যক্তি নাবালক হলেও বহু সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে ১৩ বছর বা তার বেশি বয়স হলেই নিজস্ব অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ রয়েছে।

এখানেই একটি মৌলিক আইনি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ভারতীয় আইনে নাবালকের স্বাধীনভাবে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা সীমিত। অথচ সমাজমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ব্যবহারকারীকেই প্ল্যাটফর্মের শর্ত, গোপনীয়তা নীতি এবং অন্যান্য নিয়ম মেনে নেওয়ার সম্মতি দিতে হয়। এই ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয় আইনের সামঞ্জস্য কতটা, সেই প্রশ্নেরই নিষ্পত্তি চেয়েছে আবেদনটি। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাও আদালতে এই আইনি অসঙ্গতির বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন, কেন্দ্র তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত নিয়মে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করছে।

শিশুদের সুরক্ষার যুক্তিটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সমাজমাধ্যমে অশালীন বা হিংসাত্মক বিষয়বস্তু, অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা যৌন শোষণের মতো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষত কমবয়সিরা এসব ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন না-ও হতে পারে। তাই তাদের সুরক্ষায় কার্যকর বয়স যাচাই, অভিভাবকের ভূমিকা এবং প্ল্যাটফর্মগুলির জবাবদিহি জরুরি। আদালতও স্পষ্ট করেছে যে, ভারতে কাজ করা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিকে ভারতীয় আইন মেনেই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

তবে সমস্যার সমাধান শুধু নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতির সুযোগ রাখার কথা সরকারও বলেছে। অর্থাৎ সব ধরনের ডিজিটাল ব্যবহারকে এক চোখে দেখলে চলবে না। শিক্ষা, গবেষণা বা সৃজনশীল কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অনিয়ন্ত্রিত সমাজমাধ্যম-ব্যবহার— দুটিকে আলাদা করে দেখা দরকার।

আরও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। নাবালকদের সমাজমাধ্যম-ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত যদি নেওয়া হয়, তার প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন কীভাবে হবে? বয়স যাচাইয়ের নামে শিশুদের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হলে আবার গোপনীয়তার সমস্যা দেখা দিতে পারে। মিথ্যা জন্মতারিখ দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রবণতা ঠেকানোও সহজ নয়। ফলে কেবল নিয়ম তৈরি করলেই হবে না, সেই নিয়ম বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং নিরাপদ, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

এই প্রসঙ্গে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আসতেই পারে। তরুণদের সমাজমাধ্যম-নির্ভর জনপরিসর যে ভবিষ্যতের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু কোনও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নকে রাজনৈতিক অনুমানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা তাই সমীচীন নয়।

প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত— নাবালকদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। তাদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না করে, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার এবং প্রযুক্তি সংস্থার যৌথ দায়িত্বের ভিত্তিতে একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। সমাজমাধ্যম থেকে শিশুদের সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি তাদের তথ্য, গোপনীয়তা এবং শিক্ষার অধিকার রক্ষা করা। নিষেধাজ্ঞা নয়, আইন, প্রযুক্তি এবং অভিভাবকত্বের মধ্যে সঠিক ভারসাম্যই এই জটিল সমস্যার টেকসই সমাধানের পথ দেখাতে পারে।