• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 4 November, 2026

‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো’

ঋত্বিকের একমাত্র ছবি যা সর্বজন- প্রশংসিত৷ এ ছবির নায়ক বিমল ছোটনাগপুর অঞ্চলে ‘জগদ্দল’ নামে একটি পুরোনো শেভ্রলেট গাড়ি নিয়ে ভাড়া খাটে৷ ‘জগদ্দল’ ছাড়া বিমলের দুনিয়ায় আর কেউ নেই৷ জগদ্দল তার মা, প্রেমিকা ও সঙ্গিনী৷ জীবনের লক্ষণ হলো মৃত্যু৷ বিমলকেও শেষমেশ জগদ্দলের মৃত্যু মেনে নিতে হয়৷ খণ্ড-খণ্ডভাবে গাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়৷ ছবির শেষে একটি শিশুর হাতে গাড়িটির হর্ন শুধু বাজতে থাকে৷ এটাই জীবনের ধর্ম৷ একটি প্রজন্ম শেষ হয়ে যায়, আরেকটি প্রজন্ম শুরু হয়৷

‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো’

File Photo

সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ঋত্বিকের ছবিতে অন্য কোনও দেশের ছবির প্রভাব নেই৷ তা একেবারে খাঁটি ভারতীয়৷ তাঁর ছবি যদি আমরা গভীর চিন্তাশীল মনন নিয়ে অনুধাবন করি তাহলে দেখবো তিনি তাঁর ছবিতে ঐতিহ্য, মিথ ও মিথলজিকে নতুন করে রিওয়ার্ক করিয়েছেন৷ তাই তাঁর ছবির চরিত্রদের নাম কখনও নীতা, সীতা বা অভিরাম৷

ঋত্বিক ঘটক ছিলেন একজন চলচ্চিত্রকার, কিন্তু তিনি নিজেকে পরিচালকের চাইতে বেশি শিল্পী আর স্রষ্টা বলে মনে করতেন৷ বাঙালি নামে একটি জাতি সমাজব্যবস্থার মধ্যে কীভাবে কাজ করে আসছে, তাই তাঁর নিরীক্ষার বিষয় এবং তা নিয়ে তাঁর রচনা প্রাসঙ্গিক৷ তিনি উচ্চারিতভাবে বাঙালিতে সংলগ্ন, সমর্পিত৷ বাঙালি মনের মূল সূত্রগুলিকে চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠা করতে বেশি আগ্রহী৷

এ এক অলৌকিক সমাপতন৷ ১৯২৫-এর হেমন্তের দিনে রাজশাহী শহরে ঋত্বিক ঘটকের যখন জন্ম (৪ নভেম্বর), প্রায় তখনই সের্গেই আইজেনস্টাইন তাঁর কারুবাসনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন মস্কো শহরে৷ সেই অ​র্থে ঋত্বিক ‘ব্যাটলশিপ পটেমকিন’ চলচ্চিত্রের (ডিসেম্বর ১৯২৫) সমবয়স্ক৷ তাই হয়তো ওডেসা শ​হরের বৃত্তান্তের মতোই তাঁরও জীবনবৃত্তান্ত রক্ত আর স্বপ্ন মিলেমিশে মৃত্যুকে ছলনা করে যায়৷ ঋত্বিক ঘটক প্রয়াত হন ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি৷ ঋত্বিক ঘটককে তাঁর স্বদেশবাসী প্রায় নিশ্চিতভাবেই তাঁর পূর্বসূরি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের সঙ্গে একই বন্ধনীভুক্ত দেখতে চায়৷ তাঁর কর্মজীবনকে ধ্বংসের সারমর্ম হিসাবে বর্ণনা করা হলে আমরা বুঝে নেওয়ার অবসর কম পাই যে, পশ্চিমের তারকোভস্কির মতো তিনি এখানে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি ছবির সূত্রেই হয়ে উঠেছেন আধুনিক চৈতন্যের অংশ৷ তাই যতটা তাঁর অতিরিক্ত মদ্যপান বিষয়ে আলোচনা হয়, ততটা আলোচনা হয় না তাঁর ছবিগুলি নিয়ে৷

ঋত্বিক ঘটকের প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ (১৯৫২)। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায় পরিচালকের মৃত্যুর পরে৷ অনেকে বলে থাকেন ‘নাগরিক’ যদি ১৯৫২ সালে মুক্তি পেত তবে ঋত্বিক ঘটক এই উপমহাদেশে পথিকৃতের সম্মান পেতেন। ‘নাগরিক’ ঋত্বিকের প্রথম ছবি, কিন্তু এটি তত গুরুত্বপূর্ণ ছবি নয় যা ঋত্বিকের মেধার বিচ্ছুরণে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে৷ তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮)। এটি ঋত্বিকের একমাত্র ছবি যা সর্বজন- প্রশংসিত৷ এ ছবির নায়ক বিমল ছোটনাগপুর অঞ্চলে ‘জগদ্দল’ নামে একটি পুরোনো শেভ্রলেট গাড়ি নিয়ে ভাড়া খাটে৷ ‘জগদ্দল’ ছাড়া বিমলের দুনিয়ায় আর কেউ নেই৷ জগদ্দল তার মা, প্রেমিকা ও সঙ্গিনী৷ জীবনের লক্ষণ হলো মৃত্যু৷ বিমলকেও শেষমেশ জগদ্দলের মৃত্যু মেনে নিতে হয়৷ খণ্ড-খণ্ডভাবে গাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়৷ ছবির শেষে একটি শিশুর হাতে গাড়িটির হর্ন শুধু বাজতে থাকে৷ এটাই জীবনের ধর্ম৷ একটি প্রজন্ম শেষ হয়ে যায়, আরেকটি প্রজন্ম শুরু হয়৷

তাঁর সবথেকে বিখ্যাত পর্যায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ও ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২)৷ এগুলি দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে একপ্রকার ট্রিলজি৷ এটাকে ডিসকোর্স বলা যেতে পারে৷ ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবির গল্পের অংশ নড়বড়ে, আরোপিত ও ভঙ্গুর৷ তিনি জানতেন শিল্প আপাত সত্যের প্রতিরূপ নয়, বরং তা আমাদের পৌঁছে দিতে পারে প্রকৃত সত্যের কাছাকাছি৷ তাই এই অসমসাহসী পরিচালক দাবি করতে পারেন যে, তাঁর ক্ষেত্রে সেন্টিমেন্টাল মেলোড্রামাটাও একটা ফর্ম৷ আর একটা কথা বলা যেতে পারে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবি আমরা দেখি নীতা যখন পরিবারের দায়িত্ব নেয়, তখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তা মেনে নিতে পারে না৷ তাই তাকে যখন দেবীত্ত্বে উন্নীত করা হয়, তখন তার বিসর্জন অনিবার্য হয়ে পড়ে৷ তাই এই ছবিতে নীতার মুখে ‘দাদা, আমি বাঁচতে চাই’ এই সংলাপটি আসলে একধরনের আর্তনাদ৷

ঋত্বিক ঘটকের পরবর্তী ছবি ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১)। চলচ্চিত্রটি কাহিনীর প্রয়োজনে অনাস্থা জানিয়ে নিজেই হয়ে উঠল প্রবন্ধধর্মী৷ এই ছবিতে শাখা বিস্তার করেছে দেশবিভাগ৷ সঙ্গে আছে নাট্য আন্দোলন ও তার নানা স্তর নিয়ে একধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা৷ এর সঙ্গে আছে অনসূয়া ও ভৃগুর সম্পর্ক৷ পরের ছবির নাম ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২), যা একটি মহাকাব্যিক ছবি৷ সেখানে নতুন ভারতের সন্ধান করা হয়ে থাকে৷ এই তিনটি ছবিই আসলে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে করা৷ কারণ ঋত্বিক দেশভাগকে একেবারেই মেনে নিতে পারেননি৷ তিনি বলেছিলেন, দেশীয় ঐতিহ্য ও মহাকাব্য না জানলে তাঁর ছবি বুঝতে পারা বা অনুভব করা কঠিন হয়ে পড়বে৷ কারণ, তিনি যত বড় পরিচালক, তার থেকে অনেক বড় দার্শনিক৷ তাই তাঁর ছবিগুলোতে অনেকগুলো লেয়ার থাকে৷ দর্শক তাঁর ছবি সেই সময় বুঝতে পারেনি৷ তার কারণ দর্শক সেই সময় ওই ধরনের ছবি বোঝার জন্য তৈরি ছিল না৷ এই হতাশা ও রাগের কারণে তাঁর ব্যক্তিজীবন মোটেই সুস্থির ছিল না৷ একধরনের অস্থিরতা তাঁকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খেত৷ কিন্তু তাঁর ছবির মধ্যে কোনোরকম অসংলগ্নতা ছিল না৷ এটা আমাদের আজও ভাবায়৷ এই কারণেই তিনি জিনিয়াস৷

ঋত্বিকের শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৩)। এখানে নীলকন্ঠ বাগচীকে তো ঋত্বিক ঘটকের অল্টার ইগো বলেই মনে হয়৷ ঋত্বিক সমগ্র জীবন ও রাজনীতিকে টেনে আনেন অণুবীক্ষণের নীচে৷ তাঁর মৃত্যুর পর ক্রমশ স্বদেশে ও বিদেশে ঋত্বিক-চর্চার প্রসার ঘটেছে৷ এই চর্চাকে আমরা যতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো সিনেমা নামক মাধ্যমটি ততটাই সম্প্রসারিত হতে পারবে৷ চলচ্চিত্রের যে একটা নিজস্ব ভাষা আছে, তা এইসব পরিচালকরা বারেবারেই আমাদের মনে করিয়ে দেন৷ আর চলচ্চিত্র যে শুধুমাত্র বিনোদন ও বাণিজ্যের উপকরণ নয়, আরও বেশি কিছু, তা আমাদের মনে করিয়ে দেন ঋত্বিক ঘটক৷ আপেক্ষিক সাফল্য ও ব্যর্থতার থেকেও যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল ঋত্বিক চলচ্চিত্রকে একটি চিন্তনীয় বিষয় হিসাবে সকলের সামনে তুলে ধরলেন৷ ঋত্বিককেই কোট করে বলতে হয়, ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’