• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 24 August, 2026

বৃষ্টির ঘাটতি ও কৃষির ভবিষ্যৎ : সতর্ক হওয়া প্রয়োজন

বর্ষার মূল অক্ষ এখন হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থান করছে। সাধারণত আগস্ট মাসে এই অক্ষ দক্ষিণ দিকে সরে মধ্য ও পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টি নিয়ে আসে। কিন্তু এ বছর তা হচ্ছে না। ফলে যে অঞ্চলগুলিতে কৃষির জন্য বৃষ্টির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানেই বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে

বৃষ্টির ঘাটতি ও কৃষির ভবিষ্যৎ : সতর্ক হওয়া প্রয়োজন

Image: IANS

ভারতের অর্থনীতি ও কৃষি এখনও অনেকটাই বর্ষার বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। তাই বর্ষার স্বাভাবিক ছন্দে সামান্য পরিবর্তনও দেশের কৃষি, খাদ্যদ্রব্যের দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দেশে চলতি বছরের বর্ষা ইতিমধ্যেই সেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অন্তত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে। ইতিমধ্যেই সারা দেশে বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ১৪ শতাংশ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, বর্ষার মূল অক্ষ এখন হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থান করছে। সাধারণত আগস্ট মাসে এই অক্ষ দক্ষিণ দিকে সরে মধ্য ও পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টি নিয়ে আসে। কিন্তু এ বছর তা হচ্ছে না। ফলে যে অঞ্চলগুলিতে কৃষির জন্য বৃষ্টির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানেই বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

অবশ্য দেশের সব অঞ্চলের পরিস্থিতি এক নয়। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বৃষ্টির ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২৬ শতাংশ। দক্ষিণ উপদ্বীপে ঘাটতি ২৩ শতাংশ এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে ১১ শতাংশ। মধ্য-ভারত তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় থাকলেও সেখানেও স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু বৃষ্টির পরিমাণে নয়, তার অসম বণ্টনেও।

এই পরিস্থিতি কৃষির জন্য বিশেষভাবে চিন্তার। ইতিমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে ডাল, সয়াবিন, ভুট্টা-সহ বৃষ্টিনির্ভর ফসলের চাষ হয়েছে। বৃষ্টির অনিয়ম এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি হলে ফলন কমতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষকের আয়ে এবং বাজারে খাদ্যশস্যের সরবরাহে। ফলে আগামী দিনে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা স্কাইমেট চলতি বছরের বর্ষা নিয়ে আরও উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের মতে, গোটা মৌসুমে বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের মাত্র ৮৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং খরার সম্ভাবনা রয়েছে ৭০ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ভারতীয় বর্ষাকে দুর্বল করার অন্যতম কারণ। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

তবে এখনই আতঙ্ক ছড়ানোর সময় নয়, বরং সতর্ক ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। সরকারকে বৃষ্টির ঘাটতিপ্রবণ এলাকাগুলিতে ফসলের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেচের ব্যবস্থা, উন্নত বীজ, ফসল বিমা এবং আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। কোথাও ফলন কমার আশঙ্কা থাকলে আগেভাগেই খাদ্যশস্যের মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কৃষকের ক্ষতি যেন মধ্যস্বত্বভোগী বা বাজারের অস্থিরতার কারণে আরও বাড়তে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা দরকার।বর্ষা কখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কিন্তু তার অনিয়মের অভিঘাত অনেকটাই কমানো যায় সঠিক পরিকল্পনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে।

চলতি বর্ষার ঘাটতি তাই শুধু আবহাওয়ার খবর নয়– এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখন থেকেই প্রস্তুতি নিলে আগামী দিনের ক্ষতি অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব।