‘পাহাড়ি বিছে’—এই বিশেষণ একসময় ব্যবহার করা হত ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম কিংবদন্তি বাইচুং ভুটিয়া সম্পর্কে। সিকিমের তিনকিতাম গ্রাম থেকে ভারতীয় ফুটবলের মূলস্রোতে এসে তিনি যেমন মাতিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনই মিজোরামের লুংলেই গ্রাম থেকে উঠে আসা এই ২৭ বছর বয়সি এডমন্ড লালরিন্দিকা (Edmund Lalrindika) সবার নজর কেড়ে নিলেন রবিবারের ডার্বিতে (Derby)।
এক নয়, তিন-তিনটি গোল কলকাতা ডার্বির ম্যাচে, তাও ম্যাচের প্রথমার্ধেই, ১১, ২২ ও ৪৪ মিনিটের মাথায়। এমন এক ম্যাচে এই হ্যাটট্রিক করলেন এডমন্ড (Edmund Lalrindika), যে ম্যাচ ছিল ফয়সালার ম্যাচ, যে ম্যাচে ডুরান্ড কাপের (Durand Cup) খেতাব উঠবে কার হাতে, তার ফয়সালা হওয়ার কথা ছিল। ইন্টার কাশীতে থাকাকালীন যে এডমন্ডকে (Edmund Lalrindika) দেখে তাঁকে ইস্টবেঙ্গলে (East Bengal) নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আন্তোনিও লোপেজ হাবাস (Antonio Lopez), সেই সিদ্ধান্তেরই দাম সুদে-আসলে ফেরৎ পেয়ে গেলেন স্প্যানিশ ফুটবল-গুরু। তাঁরই আবিষ্কার এডমন্ড (Edmund Lalrindika) হয়ে উঠলেন ইস্টবেঙ্গলের ডায়মন্ড (Edmund Lalrindika)। তাই এখন থেকে লালরিন্দিকাকে (Edmund Lalrindika) ‘ডায়মন্ড এডমন্ড’ নামেও ডাকতে পারেন লাল-হলুদ সমর্থকেরা।
১৯৯৭-এ ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালের বাইচুং ভুটিয়ার স্মরণীয় হ্যাটট্রিকের পর এই প্রথম ইস্টবেঙ্গলের কোনও ফুটবলার জাতীয় ক্লাব স্তরের টুর্নামেন্টে হ্যাটট্রিক করলেন। রবিবার ডার্বির এই হ্যাটট্রিকে অমিয় দেব (১৯৩৪), অসিত গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৭), বাইচুং (১৯৯৭), চিডি এডে (২০০৯) ও কিয়ান নাসিরি (২০২২)-দের ক্লাবে ঢুকে পড়লেন। এঁদের প্রত্যেকেরই ডার্বিতে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব রয়েছে।
মিজোরামের অনুর্ধ্ব ১২ দলে খেলে যাঁর ফুটবল জীবন শুরু, সেই এডমন্ডকে (Edmund Lalrindika) তৈরি করেছে প্রথমে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের জোনাল অ্যাকাডেমি, পরে এলিট অ্যাকাডেমি। ২০১৭-য় যোগ দেন ইন্ডিয়ান অ্যারোজে। পরের বছর ডাক পান বেঙ্গালুরু এফসি-র দ্বিতীয় দলে। ২০১৯-এ বেঙ্গালুরুর সিনিয়রে। সেখানে সুনীল ছেত্রীদের সঙ্গে ১৪টি ম্যাচ খেলার পর ২০১৯-এ ডেকে নেয় ইস্টবেঙ্গল (East Bengal)। সেবার আই লিগে মোহনবাগানের (Mohan Bagan) বিরুদ্ধে ১-২-এ হারে ইস্টবেঙ্গল। দলের একমাত্র গোলটিতে অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনিই।
কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের হয়ে হয়ে মোট ২৯টি ম্যাচ খেলা হয়ে গিয়েছে তাঁর। সাতটি গোল ও ছ’টি অ্যাসিস্ট করেছেন। গত আইএসএলেও মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ১-১ ড্রয়ে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে একমাত্র গোলটি ছিল তাঁরই।
‘ডায়মন্ড’ তৈরির কারিগর ‘চাণক্য’
২০১৯-এই চোট পেয়ে তাঁর ফুটবল জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু অসীম ধৈর্য্য ও হাবাসের ছোঁয়ায় ক্রমশ নিজেকে ফিরিয়ে আনেন আগের জায়গায়। ২০২৪-২৫ মরসুমে ইন্টার কাশীতে তাঁকে পান হাবাস। ইন্টার কাশীতে এসে সেরা কোচের হাতে পড়েন এবং রবিবার যে হিরের ছটা দেখা গেল, সেই হীরে তৈরি হয় এই হাবাসের হাতেই।
রবিবার ম্যাচের পর হাবাসকে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘ইন্টার কাশীতে কোচ থাকার সময় থেকেই ওকে দেখে আসছি। এডমন্ড এ দেশের অন্যতম সেরা ফুটবলার। ও সাধারণত স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে না। আজ ওকে ওই জায়গায় খেলতে হয়েছে। অথচ কী দারুন খেলল। খুবই প্রতিভাবান ফুটবলার’।
রবিবার যুবভারতীতে এডমন্ডের (Edmund Lalrindika)প্রথম গোলটি আসে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া জোরালো দূরপাল্লার শট থেকে। আলবার্তো রড্রিগেজ ও রাহুল ভেকের মাঝখান দিয়ে বল গোলের জালে জড়িয়ে দেন তিনি। ফের এডমন্ড গোল করেন ২২তম মিনিটে। হার্দিক, রামিরেজের পা হয়ে বল আসে তাঁর কাছে এবং বক্সে ঢুকে এগিয়ে আসা বিশাল কয়েথকে ধোঁকা দিয়ে ফাঁকা গোলের দিকে এগিয়ে গিয়ে বল ঠেলে দেন সঠিক জায়গায়। শেষ মুহূর্তে রাহুল ভেকে তাঁকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পারেননি।

প্রথমার্ধের একেবারে শেষে রশিদের দূরপাল্লার ফ্রি কিক বক্সের বাঁদিকে গিয়ে ল্যান্ড করলে জয় গুপ্তা তা পাঠিয়ে দেন দূরের পোস্টের দিকে, যেখানে ছিলেন এডমন্ড। জোড়া গোলের স্বাদ পেয়ে যাওয়া মিজো স্ট্রাইকার বিদ্যূৎ গতিতে গোলের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিখুঁত ভাবে বল ঠেলে দেন, যা গোটা স্টেডিয়ামে শব্দের বিষ্ফোরণ ঘটায়।
অসাধারণ এই হ্যাটট্রিকের পর তাঁকে বাঁ হাতের রিস্ট ব্যান্ডে আঁকা ক্রশ চিহ্নের দিকে আঙুল দেখিয়ে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। কী বোঝাতে চেয়েছিলেন? ম্যাচের পর এডমন্ড জানান, ‘ম্যাচের আগে আমি আর আমার বোন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম, আজ যেন হ্যাটট্রিক পাই। ঈশ্বর সেই প্রার্থনায় সাড়া দেওয়ায় তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। এই হ্যাটট্রিক পেয়ে আমি গর্বিত। তবে দলের জয়ে আরো বেশি গর্ব হচ্ছে’।
কোচের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেই যে বাজিমাত করলেন তাঁরা, তাও জানিয়ে দেন এডমন্ড (Edmund Lalrindika), ‘কোচ বলেছিলেন, বিপক্ষকে সমানে চাপে রাখতে হবে। আমরা তাঁর সেই নির্দেশই পালন করেছি। এএফসি ম্যাচে জয়ের পর যে আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলাম তা-ও এই ম্যাচে কাজে লেগেছে। এ বার সামনে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২-এর ম্যাচ। সেখানেও এরকমই ভালো খেলতে হবে আমাদের’।
আরও পড়ুন: কলম্বোয় পাডিক্কলের সেঞ্চুরি ও পন্থের চোটে ভাল-মন্দ মেশানো প্রথম দিন কাটল ভারতের
কৌশলেই মাত আল আরাবি থেকে মোহনবাগান
এএফসি ম্যাচে যে ভাবে কৌশলে মাত করে দিয়েছিলেন কুয়েতের আল আরাবিকে, রবিবার এই ম্যাচেও তাঁর কৌশলই ফারাকটা তৈরি করে দিল। কেন হাবাসকে ভারতীয় ফুটবলের ‘চাণক্য’ বলা হয়, তা আরো একবার বুঝিয়ে দিলেন তিনি।
দলের জয়ের পর অদ্ভূত শান্ত হাবাস (Antonio Lopez) জানিয়ে দেন, ‘শুরু থেকে যে আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলা দেখিয়েছে আমাদের ছেলেরা, তাতে আমি গর্বিত। এ এক স্বপ্নের ম্যাচ ছিল। আগের ম্যাচগুলোতে আমরা প্রচুর সুযোগ তৈরি করেছি, কিন্তু বেশি গোল করতে পারিনি। কিন্তু আজ প্রতিটা সুযোগেই গোল করতে পেরেছি। তফাৎটা এখানেই হয়েছে’।
এই দাপুটে জয়ের পরও অনেকে হাবাসের (Antonio Lopez) সমালোচনায় ব্যস্ত দ্বিতীয়ার্ধে রক্ষণাত্মক হয়ে যাওয়ার জন্য। এই কৌশল অবলম্বন না করলে হয়তো পাঁচ গোলের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারত ইস্টবেঙ্গল (East Bengal), এমনই ধারনা তাদের। কিন্তু হাবাসের ব্যাখ্যা, ‘দ্বিতীয়ার্ধে যে মোহনবাগান আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তা আগে থেকেই জানতাম। আমরা নিজেদের গোল এরিয়ায় একটু জায়গা দিলেই ওরা গোল করে দিত। হারছে বলে তো আর ওদের শক্তিকে অস্বীকার করতে পারি না। তাই ছেলেদের বলে দিই, ডিফেন্সে এতটুকু জায়গা দেওয়া চলবে না। যে স্কোর আছে, সেটাই থাক। তাতে আমাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না’।
এ জন্যই তো তিনি ‘চাণক্য’, যাঁকে ছেড়ে দিয়ে এখন মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট হয়তো আফসোস করছে। সঙ্গে চাণক্যেরই তৈরি ‘ডায়মন্ড’। এ মরসুমে ইস্টবেঙ্গল আর কী কী ঘটাবে, কে জানে।




