সিকিমে একটি নির্মীয়মাণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শ্রমিকদের মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল— উন্নয়নের পথে আমরা কতটা ঝুঁকি নিচ্ছি, আর সেই ঝুঁকির ভার কারা বইছে। ঘটনাটি কোনও “অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা” বলে পাশ কাটানো যায় না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সুড়ঙ্গের ভিতরে জমে থাকা মিথেন গ্যাসের বিস্ফোরণেই এই বিপর্যয়। কিন্তু এই গ্যাসের উপস্থিতি তো অজানা নয়; বরং পাহাড়ি ভূগর্ভস্থ নির্মাণে এটি এক স্বীকৃত বিপদ। তাই আসল প্রশ্ন— এই সম্ভাব্য বিপদের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি কি নেওয়া হয়েছিল?
প্রায় পঁচিশজন শ্রমিকের মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিটি সংখ্যার পিছনে আছে একটি পরিবার, একটি ভেঙে পড়া জীবন। নিহতদের মধ্যে অনেকেই উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা— ফলে এই শোক আরও কাছের হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে আরও একটি বাস্তবতা সামনে আসে– দেশের বহু বড় পরিকাঠামো প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে দূরদূরান্ত থেকে দরিদ্র শ্রমিকরা এসে জড়ো হন, এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজগুলিই তাঁদের কাঁধে বর্তায়।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি দেশের শক্তির চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ।
তিস্তার জলকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই উদ্যোগও তারই অংশ। কিন্তু এমন প্রকল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনও বিলাসিতা নয়, এটি অপরিহার্য শর্ত। সুড়ঙ্গ খননের সময় মিথেন গ্যাস, ভেঙে পড়া পাথর, হঠাৎ জল ঢুকে পড়া কিংবা অক্সিজেনের ঘাটতি— এসবই সাধারণ ঝুঁকি। তাই গ্যাস শনাক্তকরণ যন্ত্র, শক্তিশালী বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, আগুন লাগা রোধের প্রযুক্তি, জরুরি নির্গমন পথ এবং উদ্ধার পরিকল্পনা— সবকিছুই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
এখন তদন্ত শুরু হয়েছে। সিকিম সরকার একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। কিন্তু এই তদন্ত শুধু ‘কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটল’ এই প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল— গ্যাসের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই কি তা ধরা পড়েনি? নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কি চলছিল? বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছিল কি? ঠিকাদার সংস্থা ও তদারকি কর্তৃপক্ষ কি নিরাপত্তার সব নিয়ম মেনেছিল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তরই প্রকৃত দায় নির্ধারণ করবে। কারণ দায় এড়িয়ে গেলে এমন দুর্ঘটনা আবার ঘটবে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মকানুন কাগজে থাকলেই হয় না, তা বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। কর্মক্ষেত্রে সামান্য গাফিলতিও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এই ঘটনা আমাদের আরও একটি বড় প্রেক্ষাপটে ভাবতে বাধ্য করে— হিমালয়ের মতো নবীন ও ভঙ্গুর পর্বতশ্রেণিতে দ্রুত পরিকাঠামো গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ। জলবিদ্যুৎ, রাস্তা, রেলপথ, সুড়ঙ্গ— সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে এই সংঘাত কতটা নিরাপদ? ২০২৩ সালে উত্তরাখণ্ডের সিলকিয়ারা সুড়ঙ্গ ধসে পড়ার ঘটনা এখনও স্মৃতিতে টাটকা, যেখানে ৪১ জন শ্রমিককে দীর্ঘ ১৭ দিন পর উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিয়েছি?
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত হয়, রিপোর্ট তৈরি হয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ভুলে যাওয়া হয়— এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। এই চক্র ভাঙা জরুরি। প্রতিটি বিপর্যয়ের পর যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী না হয়, তবে সেই মৃত্যুগুলি বৃথা যাবে।এছাড়া, শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। যাঁরা অন্য রাজ্য থেকে এসে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন, তাঁদের কি যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়? তাঁরা কি জানেন কী বিপদের মুখে কাজ করছেন? তাঁদের জন্য কি পর্যাপ্ত বীমা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছে? দুর্ঘটনার পর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কোনও সুসংহত ব্যবস্থা কি রয়েছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।
ভারতের উন্নয়ন দরকার— বিদ্যুৎ, রাস্তা, যোগাযোগ—সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু উন্নয়নের মান শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হল বা কত কিলোমিটার সুড়ঙ্গ তৈরি হল, তা দিয়ে মাপা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মান নির্ভর করে মানুষের জীবনের মূল্য কতটা দেওয়া হচ্ছে তার উপর।
ভূগর্ভস্থ নির্মাণে সব ঝুঁকি হয়তো দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু যে মৃত্যুগুলি এড়ানো যেত, সেগুলি যেন আর না ঘটে— এটাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত। সিকিমের এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই দায়বদ্ধতার কথাই আবার মনে করিয়ে দিল।




