দেশের একাধিক রাজ্যে, বিশেষত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে, পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর যে নৃশংস ও আইনবহির্ভূত অত্যাচারের খবর ক্রমশ সামনে আসছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, গভীরভাবে ভীতিকর। বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে ভারতীয় নাগরিকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মারধর করা হচ্ছে, আটক করে রাখা হচ্ছে, এমনকি জোর করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আরও ভয়াবহ— এই হেনস্থার শিকার কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলেও খবর মিলেছে। এই ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলি একটি বিপজ্জনক প্রবণতার লক্ষণ— যেখানে ভাষা, পরিচয় ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ মিলিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে।
পরিযায়ী শ্রমিকরা ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। নির্মাণ, কারখানা, কৃষি, পরিষেবা— সব ক্ষেত্রেই তাঁদের শ্রম অপরিহার্য। পশ্চিমবঙ্গ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যান। তাঁরা যান কাজের খোঁজে, বাঁচার তাগিদে। সেখানে গিয়ে যদি তাঁদের ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তা হলে প্রশ্ন ওঠে— ভারত কি আর একটি সংবিধান-নির্ধারিত রাষ্ট্র, না কি ভাষা ও রাজনীতির ভিত্তিতে বিভাজিত একাধিক সন্দেহপ্রবণ ভূখণ্ড?
Advertisement
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, এই শ্রমিকরা নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখালেও তা মানা হচ্ছে না। আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড— সবই অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। প্রশাসনের এই মনোভাব শুধু বেআইনি নয়, সাংবিধানিক কাঠামোর সরাসরি অবমাননা। ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকের সমানাধিকারের কথা বলে, ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ দেশের যে কোনও প্রান্তে বসবাস ও কাজ করার অধিকার নিশ্চিত করে। সেই অধিকার কি আজ ভাষার ভিত্তিতে খর্ব করা যাবে?
Advertisement
আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে— এই ‘বাংলাদেশি’ তকমা কি আদৌ প্রশাসনিক ভুল, না কি পরিকল্পিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল? বাংলা ভাষাভাষী মানেই বাংলাদেশি— এই ধারণা শুধু অজ্ঞতাপ্রসূত নয়, ঐতিহাসিকভাবে ভুল এবং বিপজ্জনক। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড, বিহার—এই সব রাজ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতীয় বাঙালিরা বসবাস করছেন। স্বাধীনতার বহু আগেই তাঁদের উপস্থিতি এই ভূখণ্ডে। তাঁদের নাগরিকত্ব কি আজ প্রশ্নের মুখে পড়বে?
এখানেই কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠছে। একটি ফেডারেল রাষ্ট্রে পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেন্দ্র ও রাজ্য— উভয়ের দায়িত্ব। অথচ এই গুরুতর অভিযোগগুলির পরেও কেন্দ্রের নীরবতা চোখে পড়ার মতো। কোনও স্পষ্ট বিবৃতি নেই, কোনও কড়া নির্দেশ নেই, কোনও সর্বভারতীয় তদন্তের উদ্যোগ নেই। যে সরকার ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’-এর কথা বলে, তারা কি এই বিভাজনের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না?
রাজ্য সরকারগুলির ভূমিকাও কম দায়ী নয়। যে রাজ্যগুলিতে এই হেনস্থা ঘটছে, সেখানকার প্রশাসন কার্যত চোখ বন্ধ করে আছে বলে অভিযোগ। কোথাও কোথাও পুলিশই নাকি এই হয়রানির অংশ। এ তো প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়ংকর অপব্যবহার ছাড়া কিছু নয়।
সবচেয়ে নির্মম প্রশ্ন, মৃত্যুর দায় কে নেবে? ভাষার কারণে, পরিচয়ের সন্দেহে যদি একজন শ্রমিককে পিটিয়ে মারা হয়, তা কি ‘আইনশৃঙ্খলার সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়? নাকি তা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন? এই পরিস্থিতি ভারতের সামাজিক সংহতির জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। আজ বাঙালি, কাল হয়তো অন্য কোনও ভাষাভাষীর ক্ষেত্রে অন্য কোনও রাজ্যে এমন ঘটতে পারে। নাগরিকত্ব যদি প্রশাসনিক কাগজে নয়, রাজনৈতিক ধারণায় নির্ধারিত হয়, তবে কেউই নিরাপদ নন।
প্রয়োজন অবিলম্বে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া আইনগত ব্যবস্থা এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষায় স্পষ্ট নীতি— এই মুহূর্তে অপরিহার্য। একই সঙ্গে ভাষাগত বিদ্বেষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক সচেতনতা জরুরি।
বাংলাভাষা কোনও অপরাধ নয়। পরিযায়ী শ্রমিক হওয়াও অপরাধ নয়। ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করার পরেও যদি একজন মানুষকে নিজের দেশেই বিদেশি বলে তাড়া করা হয়, তবে তা শুধু তাঁর নয়— সমগ্র ভারতের গণতান্ত্রিক আত্মার উপর আঘাত।
এই নীরবতা ভাঙতেই হবে। না হলে ইতিহাস এই সময়কে ক্ষমা
করবে না।
Advertisement



