• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 29 October, 2026

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বনাম সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকের তথ্যের অপব্যবহার, অননুমোদিত সংগ্রহ এবং ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বেড়েছে। এই বাস্তবতায় তথ্য সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইন থাকা জরুরি। কিন্তু সেই আইন প্রণয়নের সময় সংবাদমাধ্যমের বিশেষ ভূমিকার কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থে কারও তথ্য প্রকাশ করা এবং বৃহত্তর জনস্বার্থে কোনও অনিয়মের প্রমাণ সামনে আনা এক বিষয় নয়। আইন যদি এই পার্থক্যটি যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার অপপ্রয়োগের আশঙ্কা থেকেই যায়।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বনাম সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

File Photo

গণতন্ত্রে নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর সুরক্ষিত রাখা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনই ক্ষমতাসীনদের কাজকর্মের হিসাব নেওয়া এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরাও সংবাদমাধ্যমের অপরিহার্য কর্তব্য। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত। কিন্তু ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার নামে যদি সাংবাদিকের অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ এবং সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, তবে তা শুধু সংবাদমাধ্যমের সমস্যা থাকে না, হয়ে ওঠে নাগরিকের জানার অধিকারেরও সংকট। ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ২০২৩-এর কয়েকটি বিধান নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএনপিএ) আবেদন সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।

সংবাদমাধ্যমের সংগঠনটির বক্তব্য, নতুন আইনের কয়েকটি বিধান কার্যকর থাকলে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন বাধা তৈরি হতে পারে, যা অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার পরিসরকে গুরুতরভাবে সীমিত করবে। কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে খবর প্রকাশের আগে তাঁর সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে উঠলে দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালানো কঠিন হবে। কারণ, যাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাঁর অনুমতি নিয়েই যদি তথ্য প্রকাশ করতে হয়, তবে সত্য উদ্‌ঘাটনের প্রক্রিয়া কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।

ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকের তথ্যের অপব্যবহার, অননুমোদিত সংগ্রহ এবং ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বেড়েছে। এই বাস্তবতায় তথ্য সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইন থাকা জরুরি। কিন্তু সেই আইন প্রণয়নের সময় সংবাদমাধ্যমের বিশেষ ভূমিকার কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থে কারও তথ্য প্রকাশ করা এবং বৃহত্তর জনস্বার্থে কোনও অনিয়মের প্রমাণ সামনে আনা এক বিষয় নয়। আইন যদি এই পার্থক্যটি যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার অপপ্রয়োগের আশঙ্কা থেকেই যায়।

বিশেষত অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় সরকারি দপ্তরের অনিয়ম বা দুর্নীতির খবর প্রকাশ্যে আসে এমন ব্যক্তিদের মাধ্যমে, যাঁরা পরিচয় প্রকাশ করলে বিপদের মুখে পড়তে পারেন। সংবাদদাতার কাছে তাঁদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখার নিশ্চয়তা না থাকলে তথ্যের প্রবাহ ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে তথ্য মুছে ফেলা, সম্মতি প্রত্যাহার কিংবা আগাম অনুমতির মতো বাধ্যবাধকতা সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতাকে দুর্বল করতে পারে। এর চূড়ান্ত ক্ষতি বহন করবেন সাধারণ নাগরিক, যাঁদের স্বার্থেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন অনুসন্ধান প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিচারপতি কে এস পুট্টস্বামীর মামলায় সর্বোচ্চ আদালত ব্যক্তিগত পরিসরের অধিকারকে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা দিয়েছিল। সেই অধিকারকে অস্বীকার করার কোনও অবকাশ নেই। কিন্তু সংবিধান একই সঙ্গে বাক্‌স্বাধীনতা, পেশার স্বাধীনতা এবং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারও নিশ্চিত করেছে। অতএব, একটি মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অন্য একটি মৌলিক অধিকারকে অকারণে খর্ব করা যায় না। প্রয়োজন এমন আইনি কাঠামো, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ— দুইয়েরই সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

সুপ্রিম কোর্ট আপাতত সরকারের বক্তব্য না শুনে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিতে রাজি হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নোটিস জারি করেছে। এই সিদ্ধান্তকে কোনও পক্ষের জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং বিষয়টির সাংবিধানিক গুরুত্ব বিচার করে বিস্তারিত শুনানির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্বাধীন সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সে জনস্বার্থের প্রহরী। তথ্য সুরক্ষার আইন যেন নাগরিককে রক্ষা করার হাতিয়ার হয়, ক্ষমতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখার ঢাল না হয়ে ওঠে। আদালতের বিবেচনায় তাই এমন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি, যেখানে ব্যক্তির গোপনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকবে, অথচ সত্য অনুসন্ধানের পথও বন্ধ হবে না। কারণ, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা হারালে গণতন্ত্রের ভিতই দুর্বল হয়ে পড়ে।