• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 7 October, 2026

অপ্টোজেনেটিক্স : চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল

আরও একটা ব্যাপার, এই হাইটেক যুগেও মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে কাজ করে, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতুহলের শেষ নেই। এই তিন জনের আবিষ্কার সেই রহস্য ভেদ করতে অনেকটাই সমর্থ হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবন্ত মস্তিষ্কের ভেতরে স্নায়ুকোষ কীভাবে আমাদের স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ গড়ে তোলে, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

অপ্টোজেনেটিক্স : চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল

Photo: X

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের ৫ অক্টোবর সুইডেন থেকে ভারতীয় সময় চারটে নাগাদ নোবেলজয়ী তিন বিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এঁরা হলেন আমেরিকার কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মানির পেটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল। এঁদের কৃতিত্ব ঠিক কোথায়, তা জানব। তার আগে নোবেলের ইতিহাসটা খুব সংক্ষেপে জেনে নেব।‌

আলফ্রেড বের্নহার্ড নোবেল (১৮৩৩-১৮৯৬) ছিলেন একজন প্রখ্যাত সুয়েডীয় রসায়নবিদ, প্রকৌশলী এবং উদ্ভাবক৷ তিনি একজন অস্ত্রনির্মাতাও। নাইট্রো গ্লিসারিন, সিলিকা এবং মাটি মিশিয়ে তিনি ডায়নামাইট আবিষ্কার করেন। ডায়নামাইট ছাড়াও তাঁর নিজের নামেই প্রায় ৩৫০টি পেটেন্ট ছিল৷ মৃত্যুর আগে তিনি উইল করে তাঁর অর্থ ও সুবিশাল সম্পত্তি নোবেল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য রেখে যান। উইলে আরও বলে যান, নোবেল ইনস্টিটিউটের কাজ হবে প্রতি বছর নোবেল পুরস্কারের অর্থ প্রদান করা৷ তাঁর উইল অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে সাহিত্য, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং শান্তিতে অসামান্য অবদানের জন্য প্রতি বছর একক বা যুগ্মভাবে নোবেল জ্ঞাপন করা হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার নোবেল ফাউন্ডেশন দ্বারা পরিচালিত কারোলিন্সকা ইনস্টিটিউট বিজয়ীদের নাম নির্ধারণ করেন। এমিল ফন বেরিং চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে প্রথম নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ডিপথিরিয়া রোগের টীকা আবিষ্কার করার জন্য তিনি এই পুরস্কার পান।

২০১৯ সাল পর্যন্ত, চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবমিলিয়ে ১১৭টি নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। প্রাপকদের মধ্যে ১২ জন নারীবিজ্ঞানী। প্রথম নারী হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান অস্ট্রীয়-হাঙ্গেরীয়-মার্কিন বিজ্ঞানী গের্টি কোরি। তিনি ডায়াবেটিস চিকিৎসাসংক্রান্ত কিছু মৌলিক বিষয় এবং ঔষধ আবিষ্কার করে এই পুরস্কার পান।

এবছর যে তিন বিজ্ঞানীর নাম গতকাল ভারতীয় সময়ে চারটেয় নোবেলজয়ী হিসেবে ঘোষিত হয়েছে তাঁদের গবেষণায় বিষয় ছিল অপ্টোজেনেটিকস। এখন প্রশ্ন, অপ্টোজেনেটিক্স ঠিক কী? এইক্ষেত্রে তিন বিজ্ঞানীর অবদানই-বা কী?

এককথায় অপ্টোজেনেটিক্স হল আলোর সাহায্যে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি। পেটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল চ্যানেলরোডপসিন (Channelrhodopsin) নামক একটি বিশেষ প্রোটিন আবিষ্কার করেন, যা কোষকে আলোয় সংবেদনশীল করে তোলে। কার্ল ডাইসেরথ: তিনি এই প্রোটিনটিকে ইঁদুরের স্নায়ুকোষে প্রবেশ করান এবং নীল আলোর সাহায্যে স্নায়ুসংকেত তৈরি বা নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হন। আলোর মাধ্যমে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার এই পদ্ধতি স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণায়, অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, আগামীদিনে বিপ্লব ঘটাতে পারে৷ এর ফলে পার্কিনসন্স, অ্যালঝাইমার্স বা ডিপ্রেশনের মতো জটিল মানসিক ও স্নায়বিক রোগের সমাধান সম্ভব।

মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৯০ বিলিয়ন নিউরন বা স্নায়ুকোষ রয়েছে। এতদিন নির্দিষ্ট কোনো স্নায়ুকোষ কীভাবে অনুভূতি, স্মৃতিকথা বা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে তা সূক্ষ্ম এবং সঠিকভাবে জানা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু অপটোজেনেটিক্স পদ্ধতিতে কোনও জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ফেলে নিউরনের সংকেত অন কিংবা অফ করা সম্ভব।

পিটার হেগেম্যান ও গেওর্গ নাগেল: ১৯৯০-এর দশকে জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান সবুজ একজোড়া শৈবাল নিয়ে গবেষণার সময় একটি বিশেষ প্রোটিন সনাক্ত করেন। সেটা আলোর সংস্পর্শে এলে খুব দ্রুত আয়ন চ্যানেল উন্মুক্ত করে। এর সাহায্যে তাঁরা প্রমাণ করেন যে এটি আলো ফেললেই তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে।

কার্ল ডাইসেরোথ: যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একজন প্রখ্যাত গবেষক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। কার্ল ডাইসারোথ ২০০৫ সালে ইঁদুরের নিউরনে এই প্রোটিন স্থানান্তর করেন। এভাবে তিনি প্রমাণ করেন যে, আলোর সংকেত দিয়ে মস্তিষ্কের একক কোষগুলোকে চালনা করা সম্ভব। ২০০৭ সালে তিনি অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করে জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে স্নায়ুসংকেত নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন।

অপটোজেনেটিক্স আমাদের মস্তিষ্ক সম্পর্কিত মৌলিক ধারণাকে একদম আমূল বদলে দিয়েছে। প্রতিদিন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্মোচিত হচ্ছে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য।  এর মাধ্যমে আমাদের মানবমস্তিষ্কের কার্যক্রমের ধরন সম্পর্কিত যাবতীয় রহস্য সমাধানের পথ বের করছেন বিজ্ঞানীরা।

অপটোজেনেটিক্স-এর কারণে এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। এমনকী অন্ধত্ব দূর করা ও শ্রবণযন্ত্রের উৎকর্ষ সাধনেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা স্নায়ুর বিশেষ সার্কিট উন্মোচন করতে সক্ষম হবেন। এই সার্কিটগুলো নির্দিষ্ট স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, যা স্নায়বিক ও মানসিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

আরও একটা ব্যাপার, এই হাইটেক যুগেও মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে কাজ করে, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতুহলের শেষ নেই। এই তিন জনের আবিষ্কার সেই রহস্য ভেদ করতে অনেকটাই সমর্থ হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবন্ত মস্তিষ্কের ভেতরে স্নায়ুকোষ কীভাবে আমাদের স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ গড়ে তোলে, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

এই বিপ্লবের সূচনা হয় শৈবাল থেকে। বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান এবং গেয়র্গ নাগেল এককোষী শৈবালের মধ্যে ‘চ্যানেলরোডোপসিন’ (channelrhodopsin) নামক উল্লেখযোগ্য একটি প্রোটিন আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরোথ সেই প্রোটিনকে স্নায়ুকোষের আলো-নিয়ন্ত্রিত সুইচে রূপান্তর করেন। তাদের এই যৌথ আবিষ্কার স্নায়ুবিজ্ঞানে এক নতুন যুগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।
নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীরা পাবেন একটি মেডেল, একটি সনদপত্র এবং মোট ১২ মিলিয়ন বা ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। ভারতীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় দশ কোটি টাকা।

আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের স্টকহোমে ওই দেশের যুবরাজ তিন বিজ্ঞানীর হাতে পৃথিবীর সবচাইতে মর্যাদাসূচক‌ এই পুরস্কার তুলে দেবেন।