• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 5 October, 2026

শ্যাওলার প্রোটিনে লুকিয়ে মস্তিষ্কের সুইচ: মগজ-রহস্যে আলো ফেলে চিকিৎসায় নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

বয়স্কদের ডিমেনশিয়া, তরুণদের অবসাদ, মৃগী বা পার্কিনসন্স। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতালের নিউরোলজি আর মনোরোগ বিভাগে রোজ এই সমস্যা নিয়েই বহু মানুষ আসেন। এই রোগগুলির মূল কারণ মস্তিষ্কের ঠিক কোন কোষের গোলমালে, তা বোঝাই এতদিন সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল। শৈবালে লুকিয়ে থাকা আলোর সুইচ সেই ধাঁধাই খুলে দিচ্ছে।

শ্যাওলার প্রোটিনে লুকিয়ে মস্তিষ্কের সুইচ: মগজ-রহস্যে আলো ফেলে চিকিৎসায় নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

Nobel prize in medicine honours research into mysteries of brain (Image: X/@NobelPrize)

মস্তিষ্কের একটিমাত্র স্নায়ুকোষে আলো ফেলতেই সেটি জেগে উঠল। আলো নিভতেই সে শান্ত। শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো। কিন্তু এই কাজই এখন রোজ হচ্ছে বিশ্বের নানা গবেষণাগারে। সেই যুগান্তকারী পদ্ধতির জন্যই ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল (Nobel Prize in Physiology or Medicine 2026) পেলেন তিন বিজ্ঞানী। ড. কার্ল ডাইসেরোথ (Karl Deisseroth), ড. পিটার হেগেমান (Peter Hegemann) এবং ড. গেওর্গ নাগেল (Georg Nagel)।

সোমবার স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট (Karolinska Institute) থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেলের জন্য এই তিন গবেষকের সম্মেলক কাজটিকে বেছে নিলেন নোবেল অ্যাসেমব্লির সচিব থমাস পার্লম্যান (Thomas Perlmann)।

ঠিক কীসের জন্য এই সম্মান?

এই তিন গবেষক সম্মানিত হলেন তাঁদের আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল (Light-gated Ion Channel) এবং অপটোজেনেটিক্সের আবিষ্কারের জন্য। এই পদ্ধতিতে জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের (Neuron) কাজ আলো দিয়ে চালু বা বন্ধ করা যায়। নোবেল কমিটির প্রধান পের সভেনসন (Per Svenningsson) জানিয়েছেন, মস্তিষ্ককে একটি বাস্তবিক মানচিত্রে তুলে ধরার যে সুযোগ একসময় শুধু স্বপ্নেই ছিল, এই প্রযুক্তি তা সত্য করে দেখিয়েছে। কমিটির মতে, স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ গড়ে তুলতে স্নায়ুকোষ কী ভূমিকা নেয়, তা এখন সরাসরি দেখা যাচ্ছে।

শৈবালের চোখেই লুকিয়ে ছিল সুইচ

গল্পের শুরু মস্তিষ্কে নয়। শুরু এক এককোষী সবুজ শৈবালে, যার নাম ক্ল্যামাইডোমোনাস (Chlamydomonas)। আলো টের পাওয়ার জন্য তার একটি ক্ষুদ্র চোখের মতো অংশ আছে। আলো পড়লে সেখানকার একটি প্রোটিন আয়ন চ্যানেল খুলে দেয়। তাতেই শৈবালের নড়াচড়ার সংকেত তৈরি হয়।

দশকের পর দশক এই শৈবাল নিয়ে কাজ করেছেন হেগেমান। নাগেল ও তাঁদের সহযোগীরা সেই প্রোটিনটি শনাক্ত করেন। নাম চ্যানেলরোডপসিন (Channelrhodopsin)। ২০০২-০৩ সালে তাঁরা এর জিন (Gene) বসিয়ে দেন ব্যাঙের ডিম্বাণুতে। দেখা যায়, একই প্রোটিন আলো ধরে এবং চ্যানেলও খোলে। অর্থাৎ, সেন্সর আর সুইচ, দুটোই একসঙ্গে রয়েছে এই প্রোটিনে।

ব্যাঙের ডিম থেকে জ্যান্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে

এর পরের ধাপটা দেখালেন ডাইসেরোথ। তিনি স্ট্যানফোর্ডের মনোরোগ চিকিৎসক ও গবেষক। ২০০৫ সালে তাঁর দল একটি নিরীহ ভাইরাসের মাধ্যমে চ্যানেলরোডপসিনের জিন পৌঁছে দেয় গবেষণাগারে জন্ম দেওয়া স্নায়ুকোষে। আলো ফেলতেই কোষগুলি সংকেত পাঠাতে শুরু করে।

তারপর শুরু হয় আসল পরীক্ষা। ২০০৭ সালে প্রমাণ হয়, এই পদ্ধতি জীবন্ত ইঁদুরেও কাজ করে। আলো দিয়ে এমনকি তাদের আচরণও বদলে দেওয়া যায়। সে বছরই দেখা যায়, শুধু ল্যাবেরোটরিতে নয়, অবাধে ঘুরে বেড়ানো ইঁদুরেও একই ফল মেলে।

কীভাবে কাজ করে এই পদ্ধতি?

প্রথমে বাছাই করা স্নায়ুকোষে আলো-সংবেদী প্রোটিনের জিন ঢোকানো হয়। এরপর মস্তিষ্কে বসানো হয় সরু অপটিক্যাল ফাইবার (Optical Fibre)। তার ভেতর দিয়ে নীল আলো ফেললে চ্যানেল খুলে যায় এবং কোষ সক্রিয় হয়। অন্য ধরনের আলো-সংবেদী প্রোটিন দিয়ে কোষকে থামিয়ে দেওয়াও যায়। ফলে বিজ্ঞানী ঠিক বুঝতে পারেন, কোন কোষের কোন কাজ কী আচরণের জন্য দায়ী।

ফ্রান্সিস ক্রিকের অপূর্ণ স্বপ্ন

ডিএনএ-র গঠনের সহ-আবিষ্কর্তা ফ্রান্সিস ক্রিক (Francis Crick) বহু আগেই বলেছিলেন, স্নায়ুবিজ্ঞানের দরকার এমন একটি হাতিয়ার, যা মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট ধরনের কোষকে নিয়ন্ত্রণ করবে আর বাকিদের অক্ষত রাখবে। অপটোজেনেটিক্স সেই খোঁজেরই উত্তর।

রোগের চিকিৎসায় কতটা এগোল?

নোবেল কমিটির সদস্য, ক্যারোলিনস্কার বিশিষ্ট অধ্যাপক আবদেল এল মানিরা (Abdel El Manira) জানিয়েছেন, মস্তিষ্কের কোন কোন সংযোগ বিগড়ে যায়, সেটা বুঝতে এই পদ্ধতি সাহায্য করেছে। অন্ধত্ব, অবসাদ (Depression), নেশার আসক্তি (Addiction) এবং ডিমেনশিয়ার (Dementia) গবেষণায় তার প্রভাব পড়ছে।

আলঝাইমার্স (Alzheimer’s), পার্কিনসন্স (Parkinson’s disease) এবং মৃগী (Epilepsy) নিয়ে গবেষণাতেও এই প্রযুক্তি এখন বড় ভরসা। অন্ধত্বের ক্ষেত্রে আশা আরও স্পষ্ট। ২০০৬ ও ২০০৮ সালে জিনগত ত্রুটিতে অন্ধ ইঁদুরের রেটিনায় (Retina) চ্যানেলরোডপসিন পৌঁছে দিয়ে দৃষ্টি ফেরানো গিয়েছিল। বয়সজনিত অন্ধত্বের জিন-থেরাপির জন্য ২০১১ সালে এক বড় ওষুধ সংস্থা সংশ্লিষ্ট পেটেন্টের লাইসেন্সও নেয়। ২০২১ সালে এক মানুষ রোগীর আংশিক দৃষ্টি ফেরার খবর প্রকাশিত হয় (Nature Medicine)।

তবে এখনই চিকিৎসার আশায় বুক বাঁধা ঠিক নয়। অপটোজেনেটিক্স আজও মূলত গবেষণাগারের চার দেওয়ালেই সীমাবদ্ধ। ডা. ডাইসেরোথ নিজেই আগে বলেছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে এর সবচেয়ে বড় লাভ হবে নতুন ওষুধ আবিষ্কারে এবং বর্তমান স্নায়ু-উদ্দীপন চিকিৎসাকে আরও নিখুঁত করায়।

তিনজনই কেন?

নোবেলের নিয়মে একটি বিভাগে সর্বোচ্চ তিনজনকে পুরস্কার দেওয়া যায়। অপটোজেনেটিক্সের পথে আরও কয়েকজনের অবদান ছিল। ২০১৯ সালে রামফোর্ড পুরস্কার (Rumford Prize) পেয়েছিলেন ৬ জন। ডাইসেরোথ, হেগেমান, নাগেল ছাড়াও আর্নস্ট বামবার্গ (Ernst Bamberg), এড বয়েডেন (Ed Boyden) ও গেরো মিজেনবক (Gero Miesenböck)। ২০২১ সালের লাস্কার পুরস্কার (Lasker Award) ডাইসেরোথ ও হেগেমানের সঙ্গে পেয়েছিলেন ডিটার ওয়েস্টারহেল্ট (Dieter Oesterhelt)।

আমাদের কাছে এর মানে কী?

বয়স্কদের ডিমেনশিয়া, তরুণদের অবসাদ, মৃগী বা পার্কিনসন্স। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতালের নিউরোলজি আর মনোরোগ বিভাগে রোজ এই সমস্যা নিয়েই বহু মানুষ আসেন। এই রোগগুলির মূল কারণ মস্তিষ্কের ঠিক কোন কোষের গোলমালে, তা বোঝাই এতদিন সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল। শৈবালে লুকিয়ে থাকা আলোর সুইচ সেই ধাঁধাই খুলে দিচ্ছে। আজকের নোবেল তাই আসলে আগামী দিনের চিকিৎসার ভিত।