সম্প্রতি পেট্রোল রপ্তানিকারক দেশগুলির সংস্থা ওপেক (OPEC) থেকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকের কাছে এটি হঠাৎ মনে হলেও, বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলাই যায়। কারণ ওপেক মূলত একটি কার্টেল (দাম ঠিক করা ব্যবসায়ী চক্র) যেখানে সদস্য দেশগুলি পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে উৎপাদন ও দামের উপর একধরনের গোপন সমঝোতা করে। আর এই ধরনের কার্টেল শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের উপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
মুক্ত বাজার ব্যবস্থার মূল কথা হল প্রতিযোগিতা। কিন্তু কার্টেল সেই প্রতিযোগিতাকেই বাধাগ্রস্ত করে। ফলে পণ্যের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, আর সাধারণ মানুষকে তার মূল্য চোকাতে হয়। ওপেকের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও গভীর, কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন, কৃষি, শিল্প— প্রায় সব ক্ষেত্রেই। ডিজেল থেকে সার, প্লাস্টিক থেকে বস্ত্র— সবকিছুর খরচ বেড়ে যায়।
Advertisement
তবে কার্টেল শুধু তেল বা জ্বালানির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলিতেও এর উদাহরণ রয়েছে। ইউরোপে গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী বহু সংস্থা বছরের পর বছর দাম নির্ধারণে গোপন চুক্তি করেছে বলে জরিমানা গুনতে হয়েছে। ব্রিটেনে নামী স্কুলগুলির মধ্যে ফি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সমন্বয়ের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ‘অ্যাপল’-এর মতো বড় সংস্থাকেও ই-বুকের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর জন্য অভিযুক্ত হতে হয়েছে।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে ওপেকের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদ জন আস্কারের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ১৯৭০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ওপেকের নীতির ফলে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ ক্ষতি একটি দীর্ঘমেয়াদি মন্দার সমতুল্য। অর্থাৎ, কার্টেল শুধু দাম বাড়ায় না, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ধাক্কা দেয়।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর সিদ্ধান্ত অবশ্য কোনও আদর্শগত অবস্থান থেকে নেওয়া নয়। বরং তারা নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে চায়। বর্তমানে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি হলেও ওপেকের নির্ধারিত সীমার কারণে তারা পুরোপুরি তা কাজে লাগাতে পারছিল না। ভবিষ্যতে তেলের চাহিদা কমে যেতে পারে— বিশেষ করে বিদ্যুৎচালিত যানবাহন ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের ফলে। তাই এখনই বেশি উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে লাভ বাড়াতে চাইছে তারা।
এই বাস্তবতাই একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওপেকের মতো শক্তিশালী কার্টেলের প্রভাব ধীরে ধীরে কমছে। যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী-সহ অন্যান্য দেশ যদি স্বাধীনভাবে উৎপাদন বাড়ায়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে পারে। এর সরাসরি সুফল পাবে সাধারণ মানুষ— কমবে মূল্যস্ফীতি, বাড়বে ক্রয়ক্ষমতা।
এখানেই মূল প্রশ্ন, সরকারগুলির ভূমিকা কী হওয়া উচিত? শুধু বড় কার্টেল নয়, ছোট ছোট কার্টেলের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। টেলিকম পরিষেবা, বিমান ভাড়া, আবাসন, শিক্ষা— বিভিন্ন ক্ষেত্রে যদি সংস্থাগুলি গোপনে দাম নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে তার প্রভাব পড়ে প্রতিটি পরিবারের উপর। প্রতিটি অতিরিক্ত টাকা মানে কম ক্রয়ক্ষমতা, কম সঞ্চয়, কম জীবনমান।
তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে আরও সক্রিয় হতে হবে। প্রতিযোগিতা বাড়ানো, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কার্টেল গঠনের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া—এই তিনটি ক্ষেত্রেই জোর দেওয়া দরকার। শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনে কঠোর আইনি পদক্ষেপও নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন চুক্তির সাহস কেউ না পায়।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর ওপেক ছাড়া হয়তো বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন আনবে না। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল যে, কার্টেল ভাঙা সম্ভব। আর সেই পথেই যদি এগোনো যায়, তাহলে বাজার হবে আরও প্রতিযোগিতামূলক, দাম হবে আরও যুক্তিসঙ্গত এবং শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে সাধারণ মানুষই।
Advertisement



