• facebook
  • twitter
Saturday, 2 May, 2026

ভগবান বুদ্ধ : বিকল্পের সন্ধানে

মানুষের কাছে নতুন বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংস্কৃত ভাষাকে ব্যবহার না করে স্থানীয় পালি ভাষায় উপদেশ দেওয়া শুরু করলেন।

রবিব্রত ঘোষ

বর্তমান সময়ের খুব পরিচিত দৃশ্য— রাস্তা জুড়ে অবরোধ চলছে। হয় কেন্দ্র বা রাজ্য বা স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে। সাধারণ মানুষের অসুবিধা হচ্ছে পথচারীদের অসুবিধা হচ্ছে স্কুলের ছাত্র, অফিস যাওয়া কর্মী অ্যাম্বুল্যান্সে মুমূর্ষু রোগী কারুর অসুবিধার কোনও সুরাহা নেই । প্রতিবাদ চলছে তো চলছেই।

Advertisement

দৃশ্য ২৷ কলকাতার বড় এক বিশ্ববিদ্যালযয়ে বাইরে থেকে আগন্তুক এসেছেন একটা বিষয়ের উপর বক্তৃতা দিতে। বিষয়টা আপাত অর্থে যথেষ্ট বিতর্কমূলক। কিন্তু বিরোধীপক্ষের লোকেরা প্রতিবাদে মশগুল। তাঁকে নিজের বক্তব্য রাখতেই দেওয়া হবে না।। শেষমেশ তাঁকে ওখান থেকে পালিয়ে আসতে হবে।

Advertisement

এগুলো কোনটিই আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত নয়, এগুলো সব আমরা পাশ্চাত্য থেকে পেয়েছি। অনেকদিন আগে এরকম একটি সভায় এক তথাকথিত বড় পণ্ডিতকে বলতে শুনেছিলাম, ভারতীয়রা কখনও প্রতিবাদ করে না, ভিন্ন মত পোষণ করে না। পরবর্তীকালে লক্ষ্য করেছিলাম ভারতীয় দর্শন পড়াতে গেলেই প্রথমেই একটি প্রসঙ্গ তুলে তাকে খণ্ডন করার চেষ্টা করার বিষয়টা ছিল ভারতীয় দর্শন নাকি নির্বিচার দর্শন— একজন যা বলে গেছেন অন্যরা তাকে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে চলে।

আসলে সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যেমন ফিজিক্সকে বোঝা যাবে না, ম্যাথমেটিক্সের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যেমন বায়োলজিকে বোঝা যাবে না, বায়োলজির দৃষ্টিভঙ্গিতে গিয়ে যেমন সাহিত্যচর্চাকে বোঝা যাবে না। ঠিক সেরকমই পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রাচ্যকে কখনোই বোঝা যাবে না।

প্রাচ্যের প্রতিবাদের ধারাটা অন্যরকমের। অন্যের ভুল প্রমাণিত করার মধ্যে দিয়ে আনন্দ পাওয়া নয়। বরং দেখানো যে, তোমার থেকে বড় একটা বিকল্প আমি হতে পারি। অন্যকে থামিয়ে দেওয়া নয়, নিজের অগ্রগতিকে বজায় রেখেই এক নতুন দিগন্তকে উন্মোচন করা।

ভারতের ইতিহাসে প্রথম প্রতিবাদের ধারণাটি নিয়ে আসেন বুদ্ধদেব। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ধর্ম, দৃষ্টিভঙ্গি সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধেই তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন এবং একটা ভালো বিকল্প আমাদের সঙ্গে আনতে পেরেছিলেন।

বুদ্ধদেবের প্রতিবাদ ছিল গতানুগতিক জীবনের বিরুদ্ধে। জন্মানো, শৈশব, কৈশোর, যৌবন, তারপরে বিয়ে বাচ্চা একটা সময় বয়স্ক হতে হতে মরে যাওয়া— এই ধারাবাহিক গতানুগতিক চিন্তার বিরুদ্ধে বুদ্ধদেবের প্রতিবাদ। প্রশ্ন করেছিলেন, মৃত্যুই কি শেষ নাকি মৃত্যুর পরও কিছু আছে? যদি থাকে সেখানে পৌঁছানো যায় কিনা। প্রশ্নটা নতুন ছিল না। মৃত্যুকে অতিক্রম করার একটা ধারণা উপনিষদের মধ্যেই পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে আমরা সেই মূল সূত্রটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। বুদ্ধের জীবন জীবনকে তাৎপর্যময় করে তোলার বার্তা। বুদ্ধের জীবন সেই মহান সত্যের সন্ধান দেওয়া। যে মানুষের জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে সেই অমৃতত্বকে লাভ করা।

বঙ্কিমচন্দ্র তার উপন্যাসে প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই জীবন লইয়া কি করিব। অথচ বঙ্কিমচন্দ্র যখন শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাতে গিয়েছিলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন জীবনের উদ্দেশ্য কী? বঙ্কিম উত্তর দিয়েছিলেন, আহার মিথ্যা মৈথুন।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় এই সমস্যার উল্লেখ আছে, ‘নারীর হৃদয়ে প্রেম শিশু গৃহ নয় সবখানি, আরো এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের ক্লান্ত, ক্লান্ত করে’। নিজের ভেতরে আরও এক সত্তাকে খোঁজার কথা বলেছিলেন আর এক কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তও। নাট্যকার বাদল সরকরের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকে একটি দৃশ্যকল্প আছে, যেখানে একজন আরেকজনকে বলছে কেমন আছো? তার গতানুগতিকতার কথা শুনে, প্রথম বক্তা উপদেশ দিয়েছিল পথ চলো। চলাই জীবন।

আশির দশকে সমাজবিজ্ঞানী আলভিন টপলারের দ্য থার্ড ওয়েভ বলে একটি বই বিখ্যাত হয়েছিল যাতে লেখক জানিয়েছিলেন, আজকের বিশ্বের মানুষ জীবনের উদ্দেশ্যহীনতায় ভুগছে।

অধিকাংশ মানুষের কাছে জীবন আছে, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আছে, কিন্তু কেন বেঁচে আছি? এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই। অধিকাংশ মানুষই মৃত্যুকেই তাদের নিয়তি‌ বলে মানতে শিখেছিল।

এই জায়গাতেই রয়েছে বুদ্ধের বিকল্প মত বা প্রচলিত ধ্যান-ধারণার প্রতি বিদ্রোহ। তাঁর হারানোর মতো কিছু ছিল না, রাজার পুত্র যার ললাট-লিখনই ছিল পরবর্তীকালের রাজা। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে রয়েছেন। রয়েছে সুন্দরী বধু ও পুত্র সন্তান। অথচ জীবনের মূল প্রশ্নের উত্তর সন্ধানের জন্য সবকিছুকে ছেড়ে তাঁকে দূরে চলে যেতে হয়েছিল। এক অচেনা অজানা পথে এগুতে হয়েছিল, ভেঙে চুরমার করে দিতে হয়েছিল নিরাপদ নিরাপত্তায় বাস করার ধারণাগুলিকে।

বুদ্ধের জীবনে রয়েছে সারারাত রথে চড়ে যাত্রার পর রাজ্যের শেষ সীমান্তে পৌঁছেছেন। রথের সারথি জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি যে পথের জন্য যাচ্ছেন যদি সাফল্য লাভ না করেন তাহলে কী হবে।

সাফল্য ব্যর্থতার হিসেবে অভ্যস্ত আমরা সবসময় সাফল্যটি চাই‌৷ ব্যর্থতার জন্য অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়। সরকারের জন্য হলো না, চাই কি পরিবেশের জন্য হলো না। খুব প্রচলিত কথাবার্তা যে, সমাজ আপনাকে এগুতে দেবে না৷ বুদ্ধদেব উত্তরটা দিয়েছিলেন, হ্যাঁ হতেই পারে, কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে জানবো সেই মহান লক্ষ্যের দিকে আমি এগোতে পেরেছি, শেষ সীমায় গিয়ে উপনীত হতে পারিনি। এই বক্তব্যের মধ্যেই রয়েছে বুদ্ধদেবের চিরায়ত প্রতিবাদ। মানুষ ব্যর্থতার পিছনে অজুহাত খোঁজে। সমাজ ব্যবস্থার উপরে দোষ চাপায় না, হলে সরকার কিংবা প্রশাসনের উপর এই দোষ চাপায়। না হলে অদৃষ্ট বা ভাগ্যের উপরে দোষ চাপায়। বুদ্ধদেব প্রথম বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন যে, সাফল্য বা ব্যর্থতা বড় কথা নয়। বড় হচ্ছে, তুমি যে মহান লক্ষ্যের পেছনে যাত্রা শুরু করেছো তার ঠিক কতটা কাছে পৌঁছতে পেরেছো? একই জায়গায় রয়েছো নাকি তুমি অনেকটা এগোতে পেরেছ।

আরও পরবর্তীকালে বুদ্ধত্ব লাভ করার পর তাঁর পুত্রকে উনি বলেছিলেন, আত্মদীপ ভবো। অন্ধকার ঘরে বসে আলো নিয়ে আসার জন্য চিৎকার চেঁচামেচি করো না। নিজেই আলো হয়ে ওঠো, মানুষকে আলো দাও, মানুষের পাশে দাঁড়াও। কোনও অক্ষম অজুহাত নয়। নিজের সমস্যা সমাধান নিজেকেই করতে হবে। নিজের মুক্তির চেষ্টা নিজেকেই করতে হবে, কেউ তোমাকে কিছু পাইয়ে দেবে না। সমকালীন ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই দৃষ্টিভঙ্গি যেমন এক অভিনব ছিল আজকের বর্তমান যুগেও একই রকম প্রাসঙ্গিক। যখন আমরা সবকিছুতেই দেখি মানুষ অজুহাত দেখানোর চেষ্টা করে, কারোর উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে, বুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গি এক উজ্জ্বল প্রতিবাদ। শক্তিশালী বিকল্প।

আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাই, এবার শুরু করলেন নতুন পথের সন্ধান। জানেন না তিনি কীভাবে এই প্রশ্নের উত্তর পাবেন। দু’জন গুরুর কাছে গেলেন, তাঁদের দেখানো পথে কিছুদিন সাধনা করলেন৷ কিন্তু বুঝতে পারলেন, যা চাইছেন এখানে পাবেন না, কারও সঙ্গে কোনও প্রতিবাদ নয়, ঝগড়া মারামারি নয়। এইসব সঙ্গ ত্যাগ করে নিজের মতো করে সাধনা করা শুরু করলেন। সাধনা মানে লক্ষ্যের পথে দীর্ঘ পদক্ষেপে হেঁটে চলা৷ বলা যেতে পারে, প্রায় নিজের জীবন-প্রাণ সমস্ত কিছু বাজি রেখে উনি জীবনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছিলেন। বুদ্ধের জীবনীকাররা বলেন— বোধিসত্ত্ব লাভের আগে তিনি প্রতিজ্ঞায় বলছেন, পৃথিবী আকাশ ভাঙচুর হয়ে যাক, ঝড় উঠুক প্রলয় ঘটুক, আমার শরীর অস্থিমজ্জা মাংস ধ্বংস হয়ে যাক, প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমি থামবো না। এই আপসহীনতা এক বৃহত্তর লক্ষ্যের দিকে দৃঢ় প্রত্যয়। বুদ্ধদেবের গতানুগতিক চিন্তাধারার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ নতুন বিকল্প পথ।

সমকালীন সময়ে যাবতীয় ধর্মীয় চর্চা করা হতো মূলত বৈদিক ভাষায়। আশ্চর্যের, এই সময় প্রচলিত যতগুলি সম্প্রদায় ছিল তার অধিকাংশ সম্প্রদায়ের কথ্য ভাষা কিন্তু সংস্কৃত ছিল না। অসংখ্য ছোট ছোট সম্প্রদায় ছিল যারা নিজেদের ভাষায় কথাবার্তা বলতো, যাদের কাছে সংস্কৃত ভাষা ছিল দুরূহ৷

বুদ্ধদেবই প্রথম যিনি সাধারণ মানুষের ভাষায় উপদেশ দেওয়া শুরু করলেন। মানুষের কাছে নতুন বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংস্কৃত ভাষাকে ব্যবহার না করে স্থানীয় পালি ভাষায় উপদেশ দেওয়া শুরু করলেন।

মূলধারার ভারতীয় দর্শন ভারতীয় ধর্মতাত্ত্বিক কচকচানিতে ভরপুর, যার সামান্যতম ধারণা করতে গেলেও বিরাট পড়াশোনা করতে হয়। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বুদ্ধদেব তাঁর তত্ত্ব মানুষকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করলেন গল্প বলাকে। গল্পের মধ্যে দিয়ে মানুষকে তাঁর বার্তা পৌঁছনো শুরু করলেন৷ এই গল্পগুলোই পরবর্তীকালে জাতকের গল্প হিসেবে পরিণত হয়েছিল।

প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির মতো মাটির সঙ্গে যোগাযোগহীন তাত্ত্বিক আলোচনাকে অপ্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করেছিলেন— যা আমার সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, তা নিয়ে বৃথা তর্ক করার কোনও প্রয়োজন নেই, তার পিছনে আলোচনা করার কোনও প্রয়োজন নেই। প্রাচীন ভারতে একদল নৈয়ায়িক ছিলেন‌ যাঁদের সম্বন্ধে প্রচলিত বিদ্রুপ ছিল, নৈয়ায়িকেরা যেখানে থাকেন কাকেরাও সেখানে থাকতে পারে না। আজকের আধুনিক যুগে নৈয়ায়িকেরা নেই, কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় রকে আড্ডা আছে। মানুষ বুঝুক না বুঝুক, প্রয়োজন থাকুক না থাকুক, তা নিয়ে আলোচনা করতে ব্যস্ত। তাতে কোনও সমাধান হবে বা নিজের কোনও সমস্যার সমাধান হবে কিনা তাঁদের জানা নেই, বরং সমস্যার মধ্যেই তাঁরা থাকবেন। বুদ্ধিজীবী-স্বরূপ‌ তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে নিজেকে পণ্ডিত প্রমাণ করার একটা প্রয়াস থাকবে। বুদ্ধদেব, এই মতের বিপরীতে গিয়ে বৃথা আলোচনা সময় নষ্ট করা নয়, নিজের সমস্যার সমাধান হচ্ছে কিনা তার উপরে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

একটি ঘটনা আছে, বুদ্ধদেবের কাছে তাঁর এক শিষ্য জানতে চাইছেন যে, আত্মার কি অস্তিত্ব আছে? বুদ্ধদেব নিরুত্তর৷ শিষ্য অবাক হয়ে এবার বিকল্প প্রশ্ন করল, আত্মার কোনও অস্তিত্ব নেই? এবারেও বুদ্ধ নীরব। বুদ্ধের এ সম্বন্ধে ধারণা কী এটা বুঝতে না শিষ্য যখন বিভ্রান্ত। তখন, বুদ্ধদেব পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ধরো তোমার কাছে একটা পাখি এসেছে যাকে কেউ একটা তীর দিয়ে বিদ্ধ করেছে৷ তুমি পাখিটিকে আগে তীরমুক্ত করবে নাকি, যে তীরটা পাঠিয়েছিল তার জাতি-কুল-মান জানতে চাইবে? বিভ্রান্ত শিষ্যর কাছে বুদ্ধের উপদেশ— আগে আমি পাখিটাকে সর থেকে মুক্ত করে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা কররো। আত্মা রয়েছে কি নেই তা জেনে তুমি কী করবে বরং তুমি নিজে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করো। বৃথা তর্ক আলোচনায় সময়ে কাটিয়ে দেওয়া নয়, আমাদের প্রয়োজন জীবনের অর্থটাকে অনুভব করার চেষ্টা করো। জীবনকে তাৎপর্যময় করে তোলার চেষ্টা করো, তাত্ত্বিক আলোচনার থেকেও তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ।

আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে লোক দেখানো প্রতিবাদের পথে না গিয়ে বুদ্ধদেব তাঁর জীবনব্যাপী সাধনায় আমাদের এক বিকল্প মতের ও পথের সন্ধান দিতে পেরেছিলেন ।

Advertisement