লালমাটির পথ, শাল-মহুয়ার বন, কৃষিজমি, নদী-নালা এবং মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রার এক স্বতন্ত্র ভূদৃশ্য। এই অঞ্চলের প্রকৃতি যেমন মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, তেমনই সেই প্রকৃতিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বহু লোকবিশ্বাস, আচার, উৎসব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। করম পরব সেই ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। জঙ্গলমহলের কুড়মি-সহ বিভিন্ন আদিবাসী ও লোকসমাজের কাছে করম পরব শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি প্রকৃতি, কৃষিজীবন, পারিবারিক স্মৃতি, পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক সংহতির এক গভীর সাংস্কৃতিক প্রকাশ।
করম পরবের কেন্দ্রে রয়েছে করম গাছের ডাল। এই গাছকে ঘিরে যে আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়, তার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি মানুষের নির্ভরতা এবং শ্রদ্ধার প্রতীকী প্রকাশ লক্ষ করা যায়। জঙ্গলমহলের মানুষের জীবন ঐতিহাসিকভাবে বন ও কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত। শাল, পিয়াল, মহুয়া, কুসুম, করম প্রভৃতি বৃক্ষ শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ নয়; এগুলি স্থানীয় মানুষের অর্থনীতি, খাদ্যসংস্কৃতি ও লোকবিশ্বাসেরও অংশ। ফলে করম পরবকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়। এই উৎসব মানুষের সঙ্গে বৃক্ষ, মাটি ও ঋতুচক্রের সম্পর্ককে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
করম পরবের প্রস্তুতি শুরু হয় উৎসবের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। বাড়ির উঠোন ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার করা, ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন করা এবং পূজার স্থান প্রস্তুত করার মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। গ্রামের মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী উৎসবের আয়োজন করেন। করম গাছের ডাল সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কোথাও তা গ্রামের কেন্দ্রস্থলে, কোথাও আবার বাড়ির উঠোনে বা নির্দিষ্ট পূজাস্থানে স্থাপন করা হয়। এই স্থানটি উৎসবের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং সেখানে পরপর নানা আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
করম পরবের সঙ্গে কৃষিজীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বর্ষার শেষে কৃষিকাজ যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন মানুষের জীবনে নতুন আশার সঞ্চার হয়। মাঠে বেড়ে ওঠা ধান ও অন্যান্য ফসলের দিকে তাকিয়ে কৃষক ভবিষ্যৎ ফসলের প্রত্যাশা করেন। এই সময়ে প্রকৃতি, বৃষ্টি, মাটি ও কৃষির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ভালো ফসলের কামনা করম পরবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে আরও গভীর করে। করম দেবতার কাছে পরিবার, কৃষিকাজ, ফসলের সমৃদ্ধি এবং সামাজিক কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করা হয়। অর্থাৎ ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে কৃষি-অর্থনীতি এখানে একটি সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ।
করম পরবের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ব্রত ও উপবাস। অনেক ক্ষেত্রে মহিলারা এবং তরুণীরা ব্রত পালন করেন। উপবাস, শুদ্ধতা, নিয়ম-নিষ্ঠা এবং পূজার মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের মানত বা কামনাকে প্রকাশ করেন। তবে করম পরবের সামাজিক পরিসর শুধুমাত্র ব্রতীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং গ্রামের মানুষও বিভিন্নভাবে উৎসবে অংশ নেন। ফলে ব্যক্তিগত ব্রত ক্রমে একটি সামষ্টিক উৎসবে পরিণত হয়।
এই উৎসবের প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে লোকগান ও নৃত্যে। করম পরবের রাতে গ্রামের পরিবেশ বদলে যায়। ঢোল, মাদলসহ বিভিন্ন লোকবাদ্যের তালে তালে তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ একত্রিত হন। গানের সুরে উঠে আসে প্রকৃতির কথা, কৃষকের জীবন, প্রেম, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং মানুষের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখ। এই লোকগানগুলিকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে করম পরবের প্রকৃত সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ধরা পড়বে না। এগুলি আসলে এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে মৌখিকভাবে সঞ্চারিত সামাজিক স্মৃতি ও লোকজ জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বাহক।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ করম পরবকে একটি জীবন্ত সামাজিক উৎসবে পরিণত করে। আধুনিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শহরমুখী অভিবাসন এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার মধ্যেও তরুণ-তরুণীরা যখন করমের গান ও নাচে অংশ নেন, তখন তাঁরা অজান্তেই নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হন। গ্রামের প্রবীণরা যেখানে ঐতিহ্যের ধারক, সেখানে তরুণ প্রজন্ম সেই ঐতিহ্যের বাহক। এই দুই প্রজন্মের সংযোগের মধ্য দিয়েই লোকসংস্কৃতি টিকে থাকে।
করম পরবের সঙ্গে পূর্বপুরুষ স্মরণের বিষয়টিও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক পরিবারে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে প্রতীকী আহার্য নিবেদন করা হয়। এর মধ্যে দিয়ে মৃত পরিবারের সদস্যদের স্মরণ এবং তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। পান্নার দিনে সেই নিবেদনের পর বাসি ভাত ও তরকারি গ্রহণের মাধ্যমে অনেক পরিবারে করম ব্রতীদের আনুষ্ঠানিক ব্রতভঙ্গের পর্ব সম্পন্ন হয়। এই খাদ্যাভ্যাসের মধ্যেও রয়েছে পারিবারিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার একটি বিশেষ অর্থ। খাদ্য এখানে শুধুমাত্র দৈহিক প্রয়োজন মেটানোর বস্তু নয়; তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, সম্পর্ক ও উত্তরাধিকারের সাংস্কৃতিক প্রতীক।
জঙ্গলমহলের সামাজিক কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রেও করম পরব গুরুত্বপূর্ণ। এই উৎসব মানুষকে একত্রিত করে। ধনী-দরিদ্র, বয়স্ক-তরুণ, নারী-পুরুষ— বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষ একটি সামষ্টিক উৎসবের পরিসরে মিলিত হন। গ্রামের সামাজিক সম্পর্ককে দৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই ধরনের উৎসবের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সারাবছরের ব্যস্ততা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরে এসে মানুষ উৎসবের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ পান। ফলে করম পরব সামাজিক সংহতির একটি অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করে।
করম পরবের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর পরিবেশগত তাৎপর্য। আধুনিক উন্নয়নের ফলে বনভূমি হ্রাস, ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, জলসম্পদের সংকট এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় যখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত প্রশ্ন হয়ে উঠছে, তখন প্রকৃতিনির্ভর লোকউৎসবগুলির দিকে নতুন করে তাকানোর প্রয়োজন রয়েছে। করম পরব প্রকৃতিকে কেবল সম্পদ হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার শিক্ষা দেয়। একটি গাছকে কেন্দ্র করে উৎসব, গান, প্রার্থনা ও সামাজিক মিলনের যে ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি এক ধরনের সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধাবোধ নিহিত রয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে করম পরবের চরিত্রেও পরিবর্তন আসছে। কর্মসংস্থানের সন্ধানে জঙ্গলমহলের বহু মানুষ অন্য শহর বা রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। ফলে উৎসবের সময় প্রত্যেক পরিবারের সব সদস্য একত্রিত হতে পারেন না। বনজ সম্পদের উপর নির্ভরতা কমেছে, কৃষির চরিত্র বদলেছে এবং বাজার অর্থনীতির প্রভাব গ্রামীণ জীবনে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আধুনিক বিনোদন এবং শহুরে সংস্কৃতির প্রভাবও গ্রামীণ উৎসবের উপস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে। কোথাও ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচের জায়গায় আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বা রেকর্ড করা গানের ব্যবহার বাড়ছে।
করম পরব তাই জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দিনের উৎসব নয়। এটি তাঁদের জীবনদর্শনের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিফলন। মাটি, জল, বন, গাছ, কৃষি, পরিবার, পূর্বপুরুষ এবং সমাজ— এই সমস্ত উপাদান একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে জীবনজগৎ তৈরি করেছে, করম পরব তারই একটি জীবন্ত প্রকাশ। আজ যখন বিশ্বায়ন ও দ্রুত নগরায়ণের প্রভাবে বহু স্থানীয় সংস্কৃতি পরিবর্তনের মুখোমুখি, তখন করম পরবের মতো উৎসবের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ এগুলি শুধু অতীতের স্মৃতি বহন করে না; একটি সমাজের আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ককেও ধারণ করে। করম পরবকে সংরক্ষণ করার অর্থ কেবল একটি উৎসবকে টিকিয়ে রাখা নয়, বরং তার সঙ্গে যুক্ত লোকগান, নৃত্য, আচার, লোকবিশ্বাস, কৃষিজ্ঞান, সামাজিক স্মৃতি এবং পরিবেশচেতনার ধারাকেও সংরক্ষণ করা।
জঙ্গলমহলের করম পরব তাই প্রকৃতি, কৃষি, পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও মানুষের পারস্পরিক বন্ধনের এক অনন্য সাংস্কৃতিক দলিল। লালমাটির এই ভূখণ্ডে করম গাছের ডালকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের সূচনা হয়, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির এবং বর্তমানের সঙ্গে অতীতের এক গভীর সংযোগের গল্প বলে। সময় বদলাবে, জীবনযাত্রা বদলাবে, উৎসবের আয়োজনের ধরনও বদলাবে; কিন্তু যতদিন মানুষ মাটি, প্রকৃতি, পূর্বপুরুষ ও সমাজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে স্মরণ করবে, ততদিন করম পরবও জঙ্গলমহলের লোকজ জীবনে তার নিজস্ব অর্থ ও প্রাণশক্তি নিয়ে বেঁচে থাকবে।




