• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 16 September, 2026

কূটনীতিতে বাড়ছে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা

ভারত ব্রিকসকে কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করতে চায় না। বরং সংগঠনটিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ ব্রিকস হবে ‘নন-ওয়েস্টার্ন’, কিন্তু ‘অ্যান্টি-ওয়েস্টার্ন’ নয়। এই ভারসাম্য রক্ষা বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বকে নতুন করে দুটি শিবিরে ভাগ করার পরিবর্তে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে যোগাযোগ এবং সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করাই এখন বেশি প্রয়োজন।

কূটনীতিতে বাড়ছে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা

Photo: ANI

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আজকের পৃথিবী ক্রমশ বিভক্ত। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলির জোট, অন্যদিকে রাশিয়া ও চিনকে ঘিরে শক্তির সমীকরণ, এর পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বিশ্ব রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে চলেছে, তার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে। ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি— অর্থাৎ কোনও একটি শক্তিশিবিরের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা— এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

ব্রিকসের মতো বহুমাত্রিক সংগঠনে ঐকমত্য তৈরি করা সহজ নয়। সদস্য দেশগুলির রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের থেকে আলাদা। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অবস্থানের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তার মধ্যেও দিল্লি সম্মেলনে একটি সর্বসম্মত ঘোষণা গ্রহণ করা ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

ভারতের কূটনীতির সাফল্যের একটি বড় কারণ হল, মতপার্থক্যকে অস্বীকার না করে তার মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজা। কোনও দেশের অবস্থানকে একেবারে বাতিল করে দেওয়ার পরিবর্তে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে প্রত্যেক সদস্য দেশ অন্তত বৃহত্তর নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে একমত হতে পারে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ক্ষেত্রে তাই নির্দিষ্ট কোনও দেশকে সরাসরি দায়ী না করে সাধারণভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রসঙ্গও এবার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে যে বিষয়গুলি নিয়ে মতভেদ তীব্র হতে পারত, সেগুলি সম্মেলনের ঐকমত্যকে ভেঙে দিতে পারেনি।

এই কৌশলকে শুধু ভাষার কূটনীতি বলে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে ভারতের বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ভূমিকার একটি ইঙ্গিত রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ক্ষমতাই ভারতকে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে সংঘাতের মধ্যেও আলোচনা ও যোগাযোগের দরজা খোলা রাখা সম্ভব। এর আগে জি-২০-র দিল্লি সম্মেলনেও ভারত রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলির মতপার্থক্যের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ঐকমত্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। ব্রিকসেও তার পুনরাবৃত্তি ভারতের কূটনৈতিক ধারাবাহিকতাকে স্পষ্ট করে।
এর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ভারত ব্রিকসকে কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করতে চায় না। বরং সংগঠনটিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ ব্রিকস হবে ‘নন-ওয়েস্টার্ন’, কিন্তু ‘অ্যান্টি-ওয়েস্টার্ন’ নয়। এই ভারসাম্য রক্ষা বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বকে নতুন করে দুটি শিবিরে ভাগ করার পরিবর্তে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে যোগাযোগ এবং সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করাই এখন বেশি প্রয়োজন।

দিল্লির সম্মেলন ভারতের ‘কনভেনিং পাওয়ার’-এরও পরিচয় দিয়েছে। নানা মত ও স্বার্থের দেশের নেতাদের একই টেবিলে নিয়ে আসা এবং তাঁদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা কোনও ছোট সাফল্য নয়। এর ফলে ভারত শুধু নিজের স্বার্থই রক্ষা করছে না, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির মধ্যে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও নিজের অবস্থান শক্ত করছে।

অবশ্যই ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে অনেক ক্ষেত্রে ‘উৎসাহিত করা’, ‘স্বাগত জানানো’, ‘আশা করা’ বা ‘আলোচনার দিকে এগোনো’-র মতো শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ঘোষণাপত্রের সব সিদ্ধান্ত যে অবিলম্বে বাস্তবায়িত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সব সাফল্যকে তাৎক্ষণিক চুক্তি বা বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত দিয়ে মাপা যায় না। অনেক সময় মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনার পথটি খোলা রাখাই বড় অর্জন।

ভারতের জন্য তাই দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল— বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্ব মানে শুধু নিজের মত প্রতিষ্ঠা করা নয়; অন্যের মত শুনে একটি মধ্যপথ তৈরি করাও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারত যদি এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এবং সংলাপের নীতি আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তবে আগামী দিনে গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হিসেবে তার ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে। বিভক্ত বিশ্বের মধ্যে সেতুবন্ধনের এই ক্ষমতাই ভারতের আন্তর্জাতিক মর্যাদার অন্যতম বড় ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।