• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 15 September, 2026

ব্রিকস : ভারতের কূটনীতির সাফল্য

জোটের কয়েকটি দেশের সঙ্গে ভারতের আমদানি রপ্তানির তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য সুবিধাজনক নয়। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাণিজ্য বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা বাস্তবে কাজে লাগাতে হবে। ভারতীয় পণ্য ও পরিষেবার নতুন বাজার তৈরি করা এবং রপ্তানি বাড়ানো এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রিকস : ভারতের কূটনীতির সাফল্য

Photo: Statesman

বর্তমান বিশ্বের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নানা মত, স্বার্থ ও বিরোধ থাকা সত্ত্বেও ১১টি সদস্য দেশ এবং ১০টি সহযোগী দেশের অংশগ্রহণে যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। কূটনীতির দিক থেকে এটি ভারতের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই সম্মেলন হয়েছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, বাণিজ্য-সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং পরাশক্তিগুলির পারস্পরিক টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক পরিবেশকে ক্রমশ জটিল করে তুলেছে।

ব্রিকসের ভিতরেও যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের মতো গুরুতর বিষয়ে সদস্য দেশগুলির অবস্থান এক নয়। রাশিয়া যেমন এই সংঘাতের অন্যতম পক্ষ, তেমনই বিশ্বের অন্য একটি বড় যুদ্ধেও ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে। ফলে সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে যুদ্ধের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি— এমনটা মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবু বিভিন্ন দেশের ভিন্ন অবস্থানের মধ্যে একটি যৌথ ঘোষণায় পৌঁছনো সহজ কাজ ছিল না। সেই অর্থে ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রশংসা করতেই হয়।
ব্রিকস গত দুই দশকে শুধু একটি অর্থনৈতিক জোট হিসেবে থাকেনি। ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। বিশ্বব্যবস্থায় পশ্চিমা দেশগুলির দীর্ঘদিনের প্রভাবের পাশাপাশি এখন উন্নয়নশীল দেশগুলিও নিজেদের বক্তব্য জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে। ব্রিকস সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই একটি প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অর্থনীতি, জ্বালানি, উন্নয়ন এবং বিশ্বশাসনের ক্ষেত্রে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে।

এই সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল না, কিন্তু তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। বাণিজ্য-শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বড় শক্তিগুলি কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে সদস্য দেশগুলির উদ্বেগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে আমেরিকাকে বাদ দিয়ে কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব এখনও অপরিসীম। তাই ব্রিকসের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— পশ্চিমের আধিপত্যের বিরোধিতা করেও যেন নতুন কোনও একক আধিপত্যের পথে না হাঁটে।

ভারতের জন্য সম্মেলনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল চিনের সঙ্গে সম্পর্ক। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নও অত্যন্ত জরুরি। সীমান্তে শান্তি না থাকলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রেও স্থায়ী অগ্রগতি কঠিন। তাই অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত-সমস্যার সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার দিকে ভারতকে আরও মনোযোগী হতে হবে।

ব্রিকস ভারতের সামনে আর একটি পুরনো সমস্যাও স্পষ্ট করে দিয়েছে, তা হলো— বাণিজ্য ঘাটতি। জোটের কয়েকটি দেশের সঙ্গে ভারতের আমদানি রপ্তানির তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য সুবিধাজনক নয়। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাণিজ্য বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা বাস্তবে কাজে লাগাতে হবে। ভারতীয় পণ্য ও পরিষেবার নতুন বাজার তৈরি করা এবং রপ্তানি বাড়ানো এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে ব্রিকস সম্মেলন ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। কিন্তু একটি সফল আন্তর্জাতিক সম্মেলনই শেষ কথা নয়। সম্মেলনের মঞ্চে কূটনৈতিক সাফল্য যেমন দরকার, তেমনই দেশের ভিতরে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিও জরুরি। বড় সম্মেলনের আলোর ঝলকানি শেষ হয়ে গেলে আসল পরীক্ষাটি শুরু হয় দেশের মাটিতে। ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি তখনই সত্যিকার অর্থে সাফল্য পাবে, যখন তার সুফল আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ও কল্যাণে পৌঁছবে।