• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 15 September, 2026

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: শেষ পর্যন্ত জয়ী কে?

যুদ্ধ শুধু বিদেশে পরিবর্তন আনে না, দেশের ভিতরেও তার প্রভাব পড়ে। নিরাপত্তার নামে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে, পুলিশি ব্যবস্থায় সামরিক মানসিকতা ঢুকে পড়তে পারে এবং রাষ্ট্রের বিরোধিতা করাকেও সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হতে পারে। তখন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রশ্ন করাও ‘শত্রুর পক্ষে দাঁড়ানো’ বলে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: শেষ পর্যন্ত জয়ী কে?

Photo Source- Magnific

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় দিন। আল কায়দার সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের জোড়া টাওয়ার ধসে পড়ে, পেন্টাগনে আঘাত হানে আর একটি বিমান পেনসিলভেনিয়ায় ভেঙে পড়ে। নিহত হন ২,৯৭৭ জন নিরপরাধ মানুষ। সেই দিন শুধু কয়েক হাজার প্রাণই হারায়নি, বদলে গিয়েছিল আমেরিকার রাষ্ট্রচিন্তা, নিরাপত্তানীতি এবং
সমাজের মানসিকতা।

হামলার পর আমেরিকার সামনে দুটি পথ ছিল। এক, আল কায়দার নেতৃত্ব ও ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে সীমিত সামরিক অভিযান চালানো। দুই, আফগানিস্তানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করে তালিবান সরকারকে সরিয়ে দেশটি দখলে নিয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা। আমেরিকা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিল। শুরু হয় দীর্ঘ যুদ্ধ। কিন্তু দুই দশক পর আমেরিকাকে আফগানিস্তান ছাড়তে হয়েছে, আর তালিবান আবার ক্ষমতায় ফিরেছে।

এখানেই উঠছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— এই দীর্ঘ যুদ্ধের আসল ফল কী? ৯/১১-র পর আমেরিকান রাজনীতিতে একটি বাক্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল— ‘আপনি আমাদের সঙ্গে, অথবা আমাদের বিরুদ্ধে।’ এই সরল বিভাজন ধীরে ধীরে বিদেশনীতি ও নিরাপত্তানীতির এক বিপজ্জনক মানদণ্ডে পরিণত হয়। যে কেউ আমেরিকার নীতির বিরোধিতা করলেই যেন শত্রু। অথচ রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং সন্ত্রাসবাদ এক জিনিস নয়।

আফগানিস্তানে আল কায়দা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি ছিল। কিন্তু তালিবানের লক্ষ্য ছিল মূলত আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল ও নিয়ন্ত্রণ। এই দুই শক্তিকে একই চোখে দেখা হয়েছিল। ফলে একটি নির্দিষ্ট সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে দমন করার বদলে আমেরিকা জড়িয়ে পড়েছিল দীর্ঘস্থায়ী এক রাষ্ট্রযুদ্ধে।

ইরাকেও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। সাদ্দাম হুসেনের সমর্থক, আল কায়দা-ঘনিষ্ঠ জঙ্গি, আমেরিকাবিরোধী জাতীয়তাবাদী এবং বিভিন্ন ক্ষুব্ধ গোষ্ঠী— সকলকে একই ‘শত্রু’ হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অথচ তাদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য এক ছিল না। কারও সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ ছিল, কারও সঙ্গে ছিল না। এই পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হওয়ার মূল্য দিতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ যেন ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী যুদ্ধের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ২০০১ সালে যে সামরিক ক্ষমতা ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তা এখনও কার্যকর। একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেই অনুমোদনের ভিত্তিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছেন। ফলে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা জন্মের পর থেকে আমেরিকাকে কোনও না কোনও যুদ্ধে জড়িত অবস্থাতেই দেখেছে।

যুদ্ধ শুধু বিদেশে পরিবর্তন আনে না, দেশের ভিতরেও তার প্রভাব পড়ে। নিরাপত্তার নামে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে, পুলিশি ব্যবস্থায় সামরিক মানসিকতা ঢুকে পড়তে পারে এবং রাষ্ট্রের বিরোধিতা করাকেও সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হতে পারে। তখন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রশ্ন করাও ‘শত্রুর পক্ষে দাঁড়ানো’ বলে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই লড়াই যদি আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক বিচারের সীমা অতিক্রম করে, তবে তার পরিণতি বিপজ্জনক। কারণ সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করতে গিয়ে যদি একটি রাষ্ট্র নিজেই অতিরিক্ত সামরিকীকরণ ও আইনভঙ্গের পথে হাঁটে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— শেষ পর্যন্ত জয়ী হল কে?

২৫ বছর পর ১১ সেপ্টেম্বরের দিকে ফিরে তাকিয়ে তাই শুধু নিহতদের স্মরণ করলেই হবে না। ভাবতে হবে, সেই দিনের পর আমেরিকা যে পথ বেছে নিয়েছিল, তা তাকে সত্যিই আরও নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক করেছে কি না। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই— শত্রুকে পরাজিত করার পাশাপাশি নিজের রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ ও আইনের শাসনকেও রক্ষা করতে হয়।