• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 16 September, 2026

বহুভাষিক বাস্তবতা ও সংযোগের ভাষা

অমিত শাহ নিজেও হিন্দি দিবসের অনুষ্ঠানে মাতৃভাষার গুরুত্বের কথা বলেছেন এবং অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। কারণ অন্য ভাষা শেখার পাশাপাশি নিজের ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখাও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বহুভাষিক বাস্তবতা ও সংযোগের ভাষা

Photo: Pexels

ভারত এমন একটি দেশ, যেখানে ভাষার বৈচিত্র্য তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, অসমিয়া, মালয়ালম, কন্নড়, মারাঠি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি-সহ বহু ভাষা ও উপভাষা যুগের পর যুগ দেশের মানুষের জীবন, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই কোনও একটি ভাষাকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্যের ধারণা তৈরি করতে গেলে এই বহুভাষিক বাস্তবতাকে মনে রাখা জরুরি।

১৪ সেপ্টেম্বর পালিত হয় হিন্দি দিবস। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ভারতের গণপরিষদ হিন্দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের স্মরণেই প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয়। এ বছর হিন্দি দিবসের অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, হিন্দি কোনও আঞ্চলিক ভাষার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— হিন্দির বিকাশ যেন অন্যান্য ভারতীয় ভাষার সম্মান, সংরক্ষণ ও প্রসারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হয়। একটি বহুভাষিক দেশে এই ভারসাম্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, মানুষের ইতিহাস, আবেগ, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

ভারতে হিন্দির ব্যাপক ব্যবহার অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিন্দি বা হিন্দির বিভিন্ন রূপে মানুষ কথা বলেন। বহু রাজ্যের মানুষ কর্মসূত্রে, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কিংবা দৈনন্দিন যোগাযোগে হিন্দি ব্যবহার করেন। ফলে একটি যোগাযোগের ভাষা হিসেবে হিন্দির ভূমিকা রয়েছে। আবার একই সঙ্গে দক্ষিণ ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত কিংবা পূর্ব ভারতের বহু অঞ্চলে মানুষের নিজস্ব ভাষাই তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রধান অবলম্বন। সেই বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের তিন-ভাষা নীতি, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে ভাষাশিক্ষার কাঠামো এবং সরকারি আইন ও নথিতে হিন্দির ব্যবহার নিয়ে কিছু রাজ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষত দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি রাজ্য মনে করে, ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে মানুষের পছন্দ ও রাজ্যের নিজস্ব ভাষাগত বাস্তবতার যথেষ্ট গুরুত্ব থাকা উচিত। অন্যদিকে কেন্দ্রের বক্তব্য হল, এর উদ্দেশ্য কোনও ভাষা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং ভারতীয় ভাষাগুলির বিকাশকে উৎসাহিত করা।

এই বিতর্কে সম্ভবত সবচেয়ে প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা। হিন্দি শেখার সুযোগ যেমন থাকা দরকার, তেমনই বাংলা, তামিল, অসমিয়া, মালয়ালম বা অন্য কোনও ভারতীয় ভাষা শেখা ও ব্যবহারের অধিকারও সমানভাবে মর্যাদা পাওয়া উচিত। কোনও ভাষার প্রসার অন্য ভাষার সংকোচনের কারণ হওয়া কাম্য নয়।

অমিত শাহ নিজেও হিন্দি দিবসের অনুষ্ঠানে মাতৃভাষার গুরুত্বের কথা বলেছেন এবং অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। কারণ অন্য ভাষা শেখার পাশাপাশি নিজের ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখাও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের শক্তি তার বহুত্বে। হিন্দি যদি বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হয়ে ওঠে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সেই সেতু তখনই শক্তিশালী হবে, যখন তার দুই পাশে থাকা সব ভাষা সমান সম্মান পাবে। হিন্দির বিকাশ এবং ভারতীয় ভাষাগুলির বিকাশ তাই পরস্পরের বিরোধী নয়— বরং সঠিক ভারসাম্য বজায় থাকলে তারা একে অপরকে সমৃদ্ধ করতে পারে। ভারতের ভাষানীতি ও ভাষাচর্চার সামনে এটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।