ভারত–ব্রিটেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। বহুদিন ধরে আলোচনার পর অবশেষে এই চুক্তি বাস্তবায়নের পথে এসেছে, যা শুধু বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর জন্য নয়, ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তব রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরের উপর।
এই চুক্তির অন্যতম বড় দিক হল— ভারত থেকে ব্রিটেনে রপ্তানির প্রায় ৯৯ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো বা তুলে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ব্রিটেন থেকেও ভারতে আসা প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে পণ্যের আদান-প্রদান সহজ হবে এবং ব্যবসার খরচ কমবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব দুই দেশের মোট দেশজ উৎপাদনেও পড়বে, যদিও তা খুব বড় আকারের নয়– বরং ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
এই চুক্তির ইতিবাচক প্রভাব প্রথমেই দেখা যাচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, বিশেষ করে টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্পে। ভারতের একটি বড় শক্তি হল এই খাত, যেখানে শ্রমনির্ভর উৎপাদন বেশি। এতদিন ভারতের তৈরি পোশাক ও গৃহস্থালির কাপড় ব্রিটেনে পাঠাতে তুলনামূলক বেশি শুল্ক দিতে হত। অন্যদিকে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলি শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। ফলে ভারত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ছিল। এখন সেই পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গৃহস্থালির কাপড়— যেমন বিছানার চাদর, তোয়ালে— এই বাজারে পাকিস্তানের দখল অনেক বেশি, প্রায় অর্ধেকেরও বেশি। সেখানে ভারতের অংশ ছিল মাত্র ৬-৭ শতাংশ। নতুন চুক্তির ফলে এই ব্যবধান কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের বড় বড় সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ ক্রেতাদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। আগে যেখানে মূলত মার্কিন বাজারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হত, এখন ব্রিটেনও সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে।
শুধু টেক্সটাইল নয়, জুতো, সামুদ্রিক পণ্য, গাড়ি— এই ধরনের ক্ষেত্রগুলিও এই চুক্তি থেকে লাভবান হতে পারে। কারণ এই সব পণ্যের ওপর আগে যে ৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ছিল, তা কমে যাওয়ায় ভারতীয় পণ্য এখন আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে। এর ফলে রপ্তানি বাড়তে পারে, উৎপাদন বাড়তে পারে, এমনকি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ পণ্যের ক্ষেত্রেও ভারতের বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মদ ও স্পিরিট শিল্পের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। স্কচ হুইস্কির ওপর ভারতের আমদানি শুল্ক আগে ছিল প্রায় ১৫০ শতাংশ, যা এখন ধাপে ধাপে কমে ৪০ শতাংশে নামবে। এর ফলে ব্রিটিশ মদ ভারতে তুলনামূলক সস্তা হয়ে উঠতে পারে এবং চাহিদা বাড়তে পারে।
তবে এই পরিবর্তন একদিনে হবে না। ব্যবসায়ীরা এখনই বড় আকারে আমদানি বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছেন না। বরং তারা প্রথমে কাগজপত্র, নিয়মকানুন, সরবরাহ ব্যবস্থা— এই সব কিছু ঠিকঠাক করার দিকে মন দিচ্ছেন। কারণ এফটিএ-র সুবিধা পেতে হলে ‘অরিজিন সার্টিফিকেট’ বা পণ্যের উৎস প্রমাণসহ নানা নথিপত্র ঠিক রাখতে হয়। এই প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল হতে পারে।
এখানেই আসে একটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা। ভারতের ক্ষেত্রে অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণ সুবিধা নেওয়া যায় না। বিশেষ করে ছোট ব্যবসাগুলি অনেক সময় জানেই না কীভাবে এই সুবিধা নিতে হয়। ফলে যে পণ্যের ওপর শুল্ক কমেছে, তা ব্যবহার না করেই আগের মতো ব্যবসা চলতে থাকে। অনুমান করা হয়, ভারতের মোট রপ্তানির মধ্যে মাত্র ২০-৩০ শতাংশ এই ধরনের চুক্তির সুবিধা কাজে লাগাতে পারে।
এই সমস্যার সমাধানের জন্য দরকার সচেতনতা এবং প্রশিক্ষণ। একজন পোশাক রপ্তানিকারককে যেমন জানতে হবে যে তার পণ্যের ওপর ব্রিটেনে শুল্ক কমেছে, তেমনই তাকে ক্রেতার সঙ্গে নতুন দামে চুক্তি করতে হবে। পাশাপাশি সঠিক নথিপত্র তৈরি করাও জরুরি। সরকার ও শিল্প সংগঠনগুলিকে এই বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— সব পণ্যের ক্ষেত্রে এই চুক্তি সমানভাবে কার্যকর নয়। কিছু পণ্য এখনও চুক্তির বাইরে রয়েছে।
যেমন, ব্রিটেন থেকে ভারতে আসা রূপার বড় অংশ এই চুক্তির আওতায় পড়ে না। আবার ব্রিটেনও নিজেদের শিল্প রক্ষার জন্য কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক বজায় রেখেছে, যেমন স্টিলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোটা ছাড়িয়ে গেলে বাড়তি শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
তার সঙ্গে নতুন ধরনের বাধাও সামনে আসছে। যেমন কার্বন নির্গমন সংক্রান্ত কর বা ‘কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট’ ব্যবস্থা। এর ফলে পরিবেশগত কারণে কিছু পণ্যের ওপর অতিরিক্ত খরচ চাপতে পারে, যা আবার ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলবে। অর্থাৎ শুধু শুল্ক কমলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না—নতুন নিয়মও তৈরি হয়।
তবুও সামগ্রিকভাবে এই চুক্তিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে এই ধরনের সমঝোতা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর নতুন বাণিজ্য অংশীদার খুঁজছে, আর ভারতও বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
রেডিমেড গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এই বাজারে চীনের দখল সবচেয়ে বেশি হলেও নানা কারণে তাদের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি কিছুটা কমছে। অন্যদিকে বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত একটি বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে ব্রিটেনের পোশাক আমদানির বাজারে ভারতের অংশ দ্বিগুণ হতে পারে।
এছাড়া সামগ্রিকভাবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণও বাড়তে পারে। বর্তমানে যে হারে বৃদ্ধি হচ্ছে, তার তুলনায় এই চুক্তির ফলে তা আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে দুই দেশের ভোক্তারাও উপকৃত হবেন—কারণ তারা আরও বেশি পণ্যের মধ্যে থেকে বেছে নিতে পারবেন এবং অনেক ক্ষেত্রে কম দামে ভালো মানের পণ্য পাবেন।
সব মিলিয়ে, ভারত-ব্রিটেন এফটিএ একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। তবে এটি কোনও জাদুর কাঠি নয়, যা রাতারাতি অর্থনীতিকে বদলে দেবে। এর প্রকৃত সুফল পেতে হলে সময় লাগবে, এবং তার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। যদি এই তিনটি বিষয় ঠিকভাবে সামলানো যায়, তবে আগামী এক থেকে তিন বছরের মধ্যে এর ইতিবাচক ফল স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।