• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 13 July, 2026

হরমুজ প্রণালী নিয়ে বাড়ছে ভারতের উদ্বেগ

ওমান উপকূলের কাছে সাইপ্রাস-নিবন্ধিত কনটেইনার জাহাজ ‘জিএফএস গ্যালাক্সি’-তে সাম্প্রতিক হামলা এবং তার জেরে এক ভারতীয় নাবিকের নিখোঁজ হও

হরমুজ প্রণালী নিয়ে বাড়ছে ভারতের উদ্বেগ

Pic- DW

ওমান উপকূলের কাছে সাইপ্রাস-নিবন্ধিত কনটেইনার জাহাজ ‘জিএফএস গ্যালাক্সি’-তে সাম্প্রতিক হামলা এবং তার জেরে এক ভারতীয় নাবিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আবার পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই ঘটনায় ভারত সরকারের তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই অঞ্চল শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— বিশেষ করে ভারতের মতো দেশের জন্য।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক পথ, যেখানে দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা অস্থিরতা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজারে, যার ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকেও। ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও গভীর হয়। তাই এই অঞ্চলে যেকোনো সংঘাত ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় উদ্বেগের কারণ।
সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরানের দাবি, সংশ্লিষ্ট জাহাজটি নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছিল, তাই তাকে থামানো হয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে এটি একটি অবৈধ আক্রমণ, যার জবাবে তারা বিমান হামলা চালিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রণালী বন্ধ করার হুমকি, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, বাণিজ্যিক জাহাজ ও নিরীহ নাবিকরা এই সংঘাতের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে সাধারণ নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ‘জিএফএস গ্যালাক্সি’-র ঘটনাও তারই একটি উদাহরণ।
ভারত এই প্রসঙ্গে যে অবস্থান নিয়েছে, তা যথেষ্ট পরিমিত ও দায়িত্বশীল। একদিকে যেমন হামলার নিন্দা করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভারত বারবার বলেছে, এই ধরনের সমস্যার সমাধান যুদ্ধ নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানই দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক স্তরে সক্রিয় উদ্যোগ। রাষ্ট্রসঙ্ঘ-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এই বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক শক্তিগুলিকেও সংযম দেখাতে হবে। কারণ, যুদ্ধের আগুন একবার ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শক্তি-নির্ভরতার প্রশ্ন। ভারত-সহ অনেক দেশ এখনও জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে এই ধরনের সংঘাতের সময় তাদের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। তাই বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং নিজস্ব শক্তি উৎপাদনের দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে এটাই এই ধরনের সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব রাজনীতির এক বিপজ্জনক মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তাই সব পক্ষেরই উচিত সংযম প্রদর্শন করা এবং আলোচনার পথ খোলা রাখা। যুদ্ধ কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না; বরং তা আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
ভারত যে শান্তি ও কূটনীতির পক্ষে সওয়াল করছে, সেটিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পথ। এখন দেখার, আন্তর্জাতিক মহল কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসে।