• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 17 June, 2026

বাজারে আশার আলো

পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিনের অস্থিরতার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে...

পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিনের অস্থিরতার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবর আন্তর্জাতিক রাজনীতি যেমন নতুন দিশা দেখাচ্ছে, তেমনই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভারতের শেয়ার বাজারে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। সেনসেক্স ৭৩৬ পয়েন্ট লাফিয়ে ৭৬,২৬৪-এ বন্ধ হয়েছে। এই উত্থান শুধুমাত্র সংখ্যার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি বিনিয়োগকারীদের মানসিকতার পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজারে। পশ্চিম এশিয়া বিশ্বে তেলের অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে সেখানে সংঘাত মানেই তেলের দাম বৃদ্ধি, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির উপর। কিন্তু শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতেই অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। এর ফলে ভারতের আমদানি ব্যয় কমার আশা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
একই সঙ্গে দেখা গিয়েছে, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা আবার ভারতীয় শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ শুরু করেছেন। কয়েকদিন ধরে তারা বিক্রেতার ভূমিকায় থাকলেও সোমবার তারা প্রায় ২০০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনোভাব বাজারের গতিপ্রকৃতিকে অনেকটাই প্রভাবিত করে। তাদের ফিরে আসা মানে ভারতীয় অর্থনীতির প্রতি নতুন আস্থা তৈরি হওয়া।
এই ইতিবাচক আবহে ভারতীয় মুদ্রাও শক্তিশালী হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়ে ৯৪.৭১-এ পৌঁছেছে। এটি আমদানির ক্ষেত্রে সুবিধা এনে দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থানকে কিছুটা মজবুত করে। একই দিনে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির মোট বাজার মূলধন প্রায় ৮.৫ লক্ষ কোটি টাকা বেড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
তবে এই উত্থানকে শুধুমাত্র সাময়িক উচ্ছ্বাস বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে, আবার একে স্থায়ী প্রবণতা বলেও ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বাজারের এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পেছনে মূল কারণ হল অনিশ্চয়তার অবসান। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে, আর শান্তির বার্তা সেই ভয় দূর করে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে কয়েকটি বিষয় বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে। প্রথমত, পশ্চিম এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়। যুদ্ধের ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তা পুনরুদ্ধার করতে সময় লাগবে। দ্বিতীয়ত, ভারতে বর্ষার অগ্রগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ চাহিদা অনেকটাই বর্ষার উপর নির্ভরশীল। তৃতীয়ত, বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগের প্রবাহ কেমন থাকে, সেটিও নজরে রাখতে হবে।
এছাড়া সংস্থাগুলির আর্থিক ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কেও বিনিয়োগকারীরা দৃষ্টি রাখবেন। শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উন্নতি বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে চাঙ্গা রাখতে পারে না, তার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি।
সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি ভারতীয় অর্থনীতির জন্য এক স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এটি বাজারে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয়— দু’দিকের পরিস্থিতির উন্নতি জরুরি।