• facebook
  • twitter
Monday, 16 March, 2026

ইপিএফও-র নতুন পেনশন প্রকল্প

২০১৪ সালের আগে অবসরপ্রাপ্ত বহু পেনশনভোগী কার্যত সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে গিয়েছেন, কারণ শর্তগুলি ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং বাস্তবসম্মত নয়।

প্রতীকী চিত্র

ভারতের সংগঠিত শ্রমজগতের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল কর্মচারী ভবিষ্যনিধি ও পেনশন ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্রীয় অঙ্গ কর্মচারী পেনশন প্রকল্পে হঠাৎ পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠছে স্বচ্ছতা, নীতি এবং কর্মীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিয়ে। সম্প্রতি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (EPO)-এর কেন্দ্রীয় ট্রাস্টি বোর্ড পুরনো পেনশন প্রকল্পের পরিবর্তে নতুন এমপ্লয়িজ পেনশন প্রকল্প ২০২৬ অনুমোদন করেছে। কিন্তু যে পদ্ধতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা শ্রমিক সংগঠন, পেনশনভোগী এবং বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

এই প্রকল্পের প্রভাব পড়বে প্রায় ৫.৪ কোটি সক্রিয় সদস্য এবং প্রায় ৮২ লক্ষ পেনশনভোগীর উপর। এত বড় একটি জনসমষ্টির ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল বিস্তৃত আলোচনা, মতামত সংগ্রহ এবং নীতি নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যার। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে কোনও সুস্পষ্ট পরামর্শ বা আলোচনা হয়নি। পেনশন প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৫ সালে চালু হয়েছে যে কর্মচারী পেনশন প্রকল্প, বহু বছর ধরেই তা আদালত, শ্রমিক সংগঠন এবং নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। বিশেষ করে গত এক দশকে এই প্রকল্পের কিছু পরিবর্তন কর্মীদের স্বার্থে কতটা সহায়ক হয়েছে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, পেনশন স্কিমের আওতা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে মাসিক ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়কারীদের মধ্যে। অথচ প্রথমদিকে এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল আরও বিস্তৃত কভারেজ। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছিল পেনশনযোগ্য বেতনের হিসাবের পদ্ধতিতে। আগে অবসরের আগের ১২ মাসের গড় বেতন ধরে পেনশন নির্ধারণ করা হতো। পরে সেটি বাড়িয়ে ৬০ মাস করা হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কর্মীরা তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছেন।

Advertisement

সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল উচ্চ পেনশন নেওয়ার সুযোগ নিয়ে। ২০১৪ সালের সংশোধনের পর এই সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করা কর্মীদের জন্য। পরে ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে অবসরোত্তর কিছু কর্মচারীর জন্য উচ্চ পেনশনের সুযোগ বাড়ানো হয়। তবু ২০১৪ সালের আগে অবসরপ্রাপ্ত বহু পেনশনভোগী কার্যত সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে গিয়েছেন, কারণ শর্তগুলি ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং বাস্তবসম্মত নয়। এই প্রেক্ষাপটে নতুন পেনশন প্রকল্প নিয়ে প্রত্যাশা ছিল কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে দাবি উঠছিল পিএফ অবদানের বেতনের সীমা— যা এখনও ১৫ হাজার টাকায় স্থির— তা বাড়ানোর জন্য। একইভাবে ন্যূনতম পেনশনও ২০১৪ সাল থেকে ১,০০০ টাকাতেই স্থির রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় এই পরিমাণ যে অত্যন্ত অপর্যাপ্ত, সে বিষয়ে প্রায় সর্বসম্মত মত রয়েছে।

Advertisement

কিন্তু নতুন প্রকল্পের প্রাথমিক তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত এখনও নেই। উপরন্তু, উচ্চ পেনশনের যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, সেটিকেই নতুন স্কিমে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনেক কর্মচারীরই ভবিষ্যৎ পেনশন সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। সমালোচকদের মতে, এই নীতির পেছনে মূল উদ্দেশ্য হতে পারে পেনশন তহবিলের উপর সরকারের আর্থিক দায় কমানো। প্রশাসনের যুক্তি হল, পেনশন ব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্ব বজায় রাখতে কিছু সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই ভারসাম্য রক্ষার দায় কি শুধু কর্মচারীদের উপরেই বর্তাবে?

বাস্তবে পেনশন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার অন্য পথও রয়েছে। সরকারের সরাসরি আর্থিক অংশগ্রহণ বাড়ানো, নিয়োগকর্তাদের অবদান বৃদ্ধি করা এবং কর্মীদের স্বেচ্ছা অবদান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা— এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে পেনশন তহবিলের স্থায়িত্ব বজায় রাখা সম্ভব। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দক্ষ তহবিল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মনোভাব। পেনশন কোনও অনুদান নয়, এটি কর্মজীবনের দীর্ঘ অবদানের প্রতিফল। লক্ষ লক্ষ কর্মচারী তাঁদের জীবনের সেরা সময়টি শ্রম দিয়ে কাটান এই বিশ্বাসে যে, অবসরের পর একটি ন্যূনতম নিরাপত্তা থাকবে। সেই বিশ্বাস যদি নীতিগত পরিবর্তনের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও কমে যায়।

এই কারণেই নতুন পেনশন প্রকল্প কার্যকর করার আগে সরকারের উচিত আরও বিস্তৃত আলোচনা শুরু করা। শ্রমিক সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, পেনশন বিশেষজ্ঞ এবং পেনশনভোগীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু আর্থিক বোঝা কমানো নয়, বরং কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করা।

Advertisement