• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 19 July, 2026

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের রথযাত্রা দর্শন

ছোট একখানি রথ, বাহিরবাটীর দোতলার চকমিলান বারান্দার চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া টানা হইত— একদল কীর্তনীয়া আসিত, তাহারা সঙ্গে সঙ্গে কীর্তন করিত, আর ঠাকুর ও তাঁহার ভক্তগণ ঐ কীর্তনে যোগদান করিতেন।... এইরূপে কয়েক ঘণ্টা কীর্তনের পরে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের ভোগ দেওয়া হইত এবং ঠাকুরের সেবা হইলে ভক্তেরা সকলে প্রসাদ পাইতেন।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের রথযাত্রা দর্শন

File Photo

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের রথযাত্রা দর্শনের বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই ভক্ত বলরাম বসুর প্রসঙ্গ এসে যায়। কলকাতার বাগবাজারের গৃহীভক্ত বলরাম বসু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান রসদদারদের মধ্যে একজন। প্রতিবছর রথের সময় ঠাকুরকে বাসভবনে নিতে আসতেন বলরাম। বৈষ্ণব পরিবারের ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। বলরাম ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন দক্ষিণেশ্বরে। একমাত্র বলরামের বাড়িতেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব বেশিরভাগ পদচিহ্ন রেখেছেন। অন্যদিকে ঠাকুর নিজেই ছিলেন প্রভূ জগন্নাথদেব। প্রতিদিন স্নান করে তিনি জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ গ্রহণ করতেন দেহমন শুদ্ধ রাখতে। ভক্তদেরও সে কথা বলতেন। ঠাকুর কখনও জগন্নাথদেব দর্শন করেননি। তবে হরি মহারাজ জগন্নাথদেবের মধ্যে ঠাকুরকে দর্শন করেছিলেন, ঠাকুরের গলার মালা দেখেছিলেন জগন্নাথদেবের গলায়।

আমরা কথামৃতে ১৮৮৪ এবং ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে রথযাত্রার বিবরণ পাই যেখানে দেখি ১৮৮৪-র উল্টোরথে তিনি বলরাম বসুর বাড়ি গেছেন। সোজারথে মানে রথযাত্রার দিন গিয়েছিলেন ভক্ত ঈশানের বাড়িতে। আর ১৮৮৫-র সোজা রথে অর্থাৎ রথযাত্রার দিন গিয়েছিলেন বলরাম বসুর বাড়ি। ওই বৎসর উল্টোরথের অর্থাৎ পুনর্যাত্রার বিবরণ কথামৃতে নেই। তবে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গে পাই ঠাকুর ১৮৮৫-র উল্টোরথে (পুনর্যাত্রা) বলরামের বাড়ি গিয়েছিলেন। অনেকের মতে, ঠাকুর ১৮৮৫-তে মাহেশে রথ দেখতে গিয়েছিলেন। ভক্তদের বিবরণ অনুযায়ী মাহেশের রথ তিনি ভক্তদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। ঠাকুর করজোড়ে জগন্নাথ দর্শন করে কেঁদেছিলেন। হয়েছিলেন সমাধিস্থ। ঠাকুরকে দেখতেও বেশ ভিড় হয়েছিল।

আসি কথামৃতে বর্ণিত ১৮৮৪-র রথযাত্রা বিষয়ে। ২৫ জুন, ১৮৮৪ ছিল রথযাত্রা, আষাঢ় শুক্লা দ্বিতীয়া। কথামৃতকারের বর্ণনা থেকে পাই সকালে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতায় ঈশানের বাড়ি নিমন্ত্রণে এসেছিলেন। ঠনঠনিয়ায় ঈশানের বাড়ি। সেখানে এসে ঠাকুর শুনলেন যে, পণ্ডিত শশধর স্বল্প দূরে কলেজ স্ট্রীটে, চাটুজ্যেদের বাড়ি আছেন। পণ্ডিতকে দেখবার জন্য ঠাকুরের খুব ইচ্ছা হল। ঠিক হল বিকেলে তাঁর বাড়ি যাবেন।

কথামৃতকারের-বর্ণনা অনুযায়ী বেলা প্রায় দশটায় শ্রীরামকৃষ্ণদেব ঈশানের নিচের বৈঠকখানায় ভক্তসঙ্গে বসেছিলেন। খানিক পরে নরেন্দ্র ও মাস্টার তাঁদের কলকাতার বাড়ি থেকে এলেন। তাঁরা ঠাকুরকে প্রণাম করে তাঁর কাছে বসলেন। এরপর ঈশ্বরের কথাবার্তা শুরু হল। মাঝে মাঝে নরেনের সাংসারিক কষ্টের কথাও উঠেছে সেদিন। হয়েছে কীর্তন। বিকেলে ঠাকুর গিয়েছিলেন পণ্ডিত শশধরের বাড়ি। চারিদিকে রথের মেলার আনন্দে তালপাতার ভেঁপু বাজাচ্ছে ছেলেরা। ঠাকুরের সে কি আনন্দ!

রথযাত্রার পর পুনর্যাত্রার বিবরণ পাই বলরাম বসুর বাড়িতে ১৮৮৪, ৩ জুলাই। সেখানে তিনি ভক্তদের সঙ্গেই ছিলেন। কথামৃতকার লিখেছেন, ‘আজ পুনর্যাত্রা। বৃহস্পতিবার। আষাঢ় শুক্লা দশমী। ৩রা জুলাই, ১৮৮৪। শ্রীযুক্ত বলরামের বাটীতে, শ্রীশ্রীজগন্নাথের সেবা আছে, একখানি ছোট রথও আছে। তাই তিনি ঠাকুরকে, পুনর্যাত্রা উপলক্ষে নিমন্ত্রণ করিয়াছেন। এই ছোট রথখানি বারবাটীর দোতলার চকমিলান বারান্দায় টানা হইবে। গত ২৫শে জুন বুধবারে শ্রীশ্রীরথযাত্রার দিন, ঠাকুর শ্রীযুক্ত ঈশান মুখোপাধ্যায়ের ঠনঠনিয়া বাটীতে আসিয়া নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়াছিলেন। সেই দিনেই বৈকালে কলেজ স্ট্রীটে ভূধরের বাটীতে পণ্ডিত শশধরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনদিন হইল, গত সোমবারে শশধর তাঁহাকে দক্ষিণেশ্বর-কালীমন্দিরে দ্বিতীয়বার দর্শন করিতে গিয়াছিলেন।

ঠাকুর ভক্তদের সহিত কথা কহিতেছেন। কাছে রাম, মাস্টার, বলরাম, মনোমোহন, কয়েকটি ছোকরা ভক্ত, বলরামের পিতা প্রভৃতি বসিয়া আছেন।…’
ইতিমধ্যে ছোট রথটি বাইরের দোতলার বারান্দার উপর আনা হয়েছে। শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব, সুভদ্রা ও বলরাম ফুলমালায় সাজিয়ে গয়না ও নববস্ত্র পীতাম্বর পরেছেন। বলরামের সাত্ত্বিক পূজা, কোন আড়ম্বর নেই। বাইরের লোকে জানেও না যে, বাড়িতে রথ হচ্ছে।এবার ঠাকুর ভক্তদের সঙ্গে রথের সামনে এসেছেন। বারান্দাতেই রথ টানা হবে। ঠাকুর রথের দড়ি ধরে কিছুক্ষণ টানলেন। পরে গান ধরলেন—নদে টলমল টলমল করে গৌরপ্রেমের হিল্লোলে রে।

ঠাকুর নৃত্য শুরু করলেন। ভক্তেরাও সেই সঙ্গে নাচছেন ও গাইছেন। কীর্তনীয়া বৈষ্ণবচরণ, সম্প্রদায়ের সঙ্গে গানে ও নৃত্যে যোগদান করলেন। দেখতে দেখতে সমস্ত বারান্দা পরিপূর্ণ হয়ে গেল। মেয়েরাও ঘর থেকে এই প্রেমানন্দ দেখছেন! যেন শ্রীবাসমন্দিরে শ্রীগৌরাঙ্গ ভক্তসঙ্গে হরিপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে নৃত্য করছেন। সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুর জগন্মাতার নাম করতে লাগলেন। মনে হল আজ বলরামের বাড়ি যেন নবদ্বীপ হয়ে উঠেছে। বাইরে নবদ্বীপ, ভেতরে বৃন্দাবন। ওই রাতেই ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে গেলেন।

এবার আমরা ঠাকুরকে পাব পরের বছরের রথযাত্রায় ১৪ জুলাই ১৮৮৫-তে বলরামের বাড়িতে। তাঁর আগের দিন বলরামের বাড়িতে ছিলেন ঠাকুর। বলরাম ঠাকুরকে নিমন্ত্রণ করে এনেছেন বলরাম। বাড়িতে শ্রীশ্রীজগন্নাথ-বিগ্রহের নিত্য সেবা হয়। সকালে ঠাকুর উঠে একা নৃত্য করছেন ও মধুর কণ্ঠে নাম করছেন। মাস্টার এসে প্রণাম করলেন। ক্রমে ভক্তেরা এল, প্রণাম করে ঠাকুরের কাছে বসলেন। সেদিন সকালে হালকা ভুমিকম্প হয়েছিল। ঈশ্বরীয় কথাবার্তার মধ্যে সে প্রসঙ্গ ওঠে। ভক্তরা ভয় পেয়েছিলেন খুব।

বলরাম বসু আজ কীর্তনের বন্দোবস্ত করেছেন, বৈষ্ণবচরণ ও বেনোয়ারীর কীর্তন। বৈষ্ণবচরণ গাইছেন— শ্রীদুর্গানাম জপ সদা রসনা আমার। দুর্গমে শ্রীদুর্গা বিনে কে করে নিস্তার। গান শুনতে শুনতে ঠাকুর সমাধিস্থ! দাঁড়িয়ে সমাধিস্থ!— ছোট নরেন ধরে আছেন।
নাম করতে করতে অনেকক্ষণ পরে সমাধিভঙ্গ হল। দুপুরবেলা। বারান্দায় শ্রীশ্রীজগন্নাথের সেই ছোট রথটি পতাকা দিয়ে সাজিয়ে আনা হয়েছে। শ্রীশ্রীজগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামকে চন্দন মাখানো ও বসন-ভূষণ ও ফুল ও মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে। ঠাকুর বারান্দায় রথের আগে আগে যাচ্ছেন।— ভক্তেরাও সঙ্গে সঙ্গে চললেন। রথের দড়ি ধরে একটু টানলেন ঠাকুর। কীর্তনের সঙ্গে শুরু হল নাচ। ভক্তেরাও সঙ্গে সঙ্গে প্রেমোন্মত্ত হয়ে নাচছেন। পরে নরেন তানপুরা নিয়ে আবার গান গেয়েছিলেন।

সেদিন রাতে বলরামের বাড়িতেই ছিলেন ঠাকুর। পরের দিন সকাল নটায় ফিরে যান দক্ষিণেশ্বরে। এই হল পরপর দুবছরের ঠাকুরের রথ দর্শনের বর্ণনা। দক্ষিণেশ্বরে অবস্থান কালে ঠাকুরের রথ দর্শন নিয়ে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ থেকে যে বর্ণনা পাই তা এরকম— ‘এই বাটীতে (বলরাম বসু) শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের সেবা ছিল, কাজেই রথের সময় রথটানাও হইত, কিন্তু সকলই ভক্তির ব্যাপার, বাহিরের আড়ম্বর কিছুই নাই। বাড়ি সাজানো, বাদ্যভাণ্ড, বাজে লোকের হুড়াহুড়ি, গোলমাল, দৌড়াদৌড়ি— এ সবের কিছুই নাই। ছোট একখানি রথ, বাহিরবাটীর দোতলার চকমিলান বারান্দার চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া টানা হইত— একদল কীর্তনীয়া আসিত, তাহারা সঙ্গে সঙ্গে কীর্তন করিত, আর ঠাকুর ও তাঁহার ভক্তগণ ঐ কীর্তনে যোগদান করিতেন।… এইরূপে কয়েক ঘণ্টা কীর্তনের পরে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের ভোগ দেওয়া হইত এবং ঠাকুরের সেবা হইলে ভক্তেরা সকলে প্রসাদ পাইতেন। তারপর অনেক রাত্রে এই আনন্দের হাট ভাঙিত এবং ভক্তেরা দুই-চারি জন ব্যতীত যে যাঁহার বাটীতে চলিয়া যাইতেন। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের উলটা রথের কথাই আমরা এখানে বলিতেছি। ঠাকুর এই বৎসর ওই দিন এখানে আসিয়া বলরামবাবুর বাটীতে দুই দিন দুই রাত থাকিয়া তৃতীয় দিনে বেলা আটটা-নয়টার সময় নৌকা করিয়া দক্ষিণেশ্বরে প্রত্যাগমন করেন’।