• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 17 July, 2026

দুর্নীতির তদন্তে কমিশন

রাজ্য সরকার একটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণা করেছে, যার নেতৃত্বে থাকবেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু

দুর্নীতির তদন্তে কমিশন

File Photo

পশ্চিমবঙ্গে গত ১৫ বছরের প্রশাসনিক পর্বকে ঘিরে যে দুর্নীতির অভিযোগ বহুদিন ধরে জনমানসে ঘুরপাক খাচ্ছিল, তা এবার আনুষ্ঠানিক তদন্তের মুখে পড়তে চলেছে। রাজ্য সরকার একটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণা করেছে, যার নেতৃত্বে থাকবেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু অতীতের অভিযোগ খতিয়ে দেখার চেষ্টা নয়, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা পুনর্গঠনের একটি পরীক্ষা।

২০১১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দফতরে আর্থিক অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করবে এই কমিশন। শিক্ষা, খাদ্য ও সরবরাহ, ত্রাণ, পঞ্চায়েত, পুরসভা, আবাসন, শিল্প, ভূমি— প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরই এর আওতায়। অভিযোগের তালিকাও ছোট নয়— নিয়োগে দুর্নীতি, আমফান ত্রাণ বণ্টনে অনিয়ম, আবাস যোজনায় অর্থের অপব্যবহার, ১০০ দিনের কাজে দুর্নীতি, এমনকি মধ্যাহ্নভোজন প্রকল্পেও গরমিলের কথা উঠে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো, নতুন রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা। সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই এইসব অভিযোগের কথা শুনে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে বিরোধীরা সরব হয়েছে, আদালতেও কিছু মামলা হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব ছিল। তাই নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে এই কমিশন গঠন করেছে—এটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার একটি পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে এই উদ্যোগকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

যদি সত্যিই তদন্ত নিরপেক্ষভাবে হয় এবং প্রমাণ-ভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়, তাহলে তা রাজ্যের প্রশাসনিক সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থের অপচয় নয়, এটি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। একজন সাধারণ নাগরিক যখন দেখে যে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা তার কাছে পৌঁছচ্ছে না, তখন তার বিশ্বাস ভেঙে যায়।কমিশনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, এটি শুধু তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজনে এফআইআর দায়েরের সুপারিশ করতে পারবে এবং বেআইনি উপায়ে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও থাকবে। অর্থাৎ, এটি কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এগোতে পারবে, যা অতীতে অনেক তদন্তেই দেখা যায়নি।

তবে এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। একটি কমিশন গঠন করা সহজ, কিন্তু তার কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা কঠিন। তদন্তের সময় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি। যদি কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হয়, তাহলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। একইভাবে, তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতা বা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে গেলে তার ফলাফলও প্রশ্নের মুখে পড়বে।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই তদন্ত যেন শুধুমাত্র অতীতের বিচারেই সীমাবদ্ধ না থাকে। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা যায়, সেটাও ভাবতে হবে। দুর্নীতি রোধের জন্য শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, এবং নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানো—এইসব দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এই পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে— এটি তাদের বার্তা। কিন্তু একই সঙ্গে তাদেরও প্রমাণ করতে হবে যে তারা শুধুমাত্র অভিযোগ তুলছে না, বরং একটি সুশাসনের পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম। কারণ ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও যদি প্রশাসনিক সংস্কৃতি না বদলায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন কোনও পরিবর্তন আসবে না। এই বিচারবিভাগীয় কমিশন একটি সুযোগ— অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ কতটা আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়। জনগণ অপেক্ষায় থাকবে— সত্য উদঘাটিত হবে কি না, এবং দোষীদের যথাযথ শাস্তি মিলবে কি না।