তামিলনাড়ু সরকারের উদ্যোগে গঠিত উচ্চপর্যায়ের এক কমিটি সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে ভারতের ফেডারেল কাঠামো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই কমিটি কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ইতিহাস, সংবিধান সভার বিতর্ক এবং অতীতের একাধিক কমিশনের সুপারিশ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে— গত কয়েক দশকে কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং তা সুস্থ গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয়। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট– ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এখন কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন, যা ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের সমতুল্য।
ভারতের সংবিধান রচিত হয়েছিল দেশভাগের ক্ষত, দেশীয় রাজ্যগুলির সংযুক্তিকরণ এবং জাতীয় ঐক্যের তাগিদের প্রেক্ষাপটে। সেই সময়ে শক্তিশালী কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইন প্রণয়ন, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপ কেন্দ্রীকরণের ধারাকে আরও মজবুত করেছে। কমিটির যুক্তি, এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে এবং ভারতের আকার, বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিকেন্দ্রীভূত শাসনই উন্নয়নের টেকসই পথ।
Advertisement
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া একটি ফেডারেল রাষ্ট্রের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সহজ। এর ফলে কেন্দ্রীকরণের একটি স্বয়ংক্রিয় চক্র তৈরি হয়। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা বিলোপ করে তাকে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভেঙে দেওয়া— এই প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। জম্মু ও কাশ্মীরের ঘটনায় অনেকেই দেখেছেন, একটি রাজ্যের ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক অবস্থান কত দ্রুত কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে বদলে যেতে পারে।
Advertisement
ভাষানীতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি। ‘এক দেশ, এক ভাষা’ ধারণা ভারতের বহুভাষিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা-সংক্রান্ত জোরালো অবস্থান দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্বের একাধিক রাজ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, তা সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়েরও ভিত্তি। ফেডারেল কাঠামো সেই বহুত্বকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
রাজ্যপালদের ভূমিকাও প্রতিবেদনে প্রশ্নের মুখে। বহু ক্ষেত্রে রাজ্যপালদের আচরণকে রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছে। এতে রাজ্যগুলির সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ণ হয়। একই সঙ্গে আসন্ন লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সফল রাজ্যগুলি আশঙ্কা করছে, তারা জাতীয় রাজনীতিতে আপেক্ষিক প্রতিনিধিত্ব হারাতে পারে।
আর্থিক ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের প্রভাব বেড়েছে। পণ্য ও পরিষেবা কর (GST) চালুর পর রাজস্ব কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ‘গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স’ ব্যবস্থায় রাজ্যগুলির আর্থিক স্বাধীনতা কিছুটা সীমিত হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, যা আগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজ্যের এক্তিয়ারে ছিল, সেগুলিতেও কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণ বাড়ছে। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, এমনকি প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের প্রভাব ক্রমবর্ধমান।
কমিটির বক্তব্য, এই ধারাবাহিক কেন্দ্রীকরণ গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। ভারতের অগ্রগতি ও সামাজিক সংহতির জন্য শক্তিশালী ফেডারেল কাঠামো অপরিহার্য। বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থানীয় চাহিদা ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়, প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ায় এবং আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করে। একটি উপমা টেনে কমিটি বলেছে— যেমন ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক সংস্কার নতুন দিশা দেখিয়েছিল, তেমনই এখন প্রয়োজন ফেডারেল কাঠামোর এক সাহসী পুনর্বিবেচনা।
এই প্রতিবেদনকে কেবল একটি রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি বৃহত্তর জাতীয় আলোচনার সূচনা। শক্তিশালী কেন্দ্র অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে সমানতালে শক্তিশালী রাজ্যও দরকার। ভারত যদি সত্যিই তার বহুত্ববাদী চরিত্র ও গণতান্ত্রিক চেতনা অটুট রাখতে চায়, তবে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য পুনর্গঠন অনিবার্য।
অতএব, কুরিয়ান জোসেফ কমিটির সুপারিশগুলি নিয়ে সর্বস্তরে আলোচনা হওয়া জরুরি। সংবিধানের মূল চেতনাকে সামনে রেখে, সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই ভারতের অগ্রযাত্রা অধিকতর নিরাপদ ও স্থায়ী হতে পারে।
Advertisement



