শামীম হক মণ্ডল
গত শনিবার, ইজরাইলের ডেল্টা ফোর্স ও মার্কিন বাহিনীর যৌথ অভিযানে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। জবাব স্বরূপ ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (Islamic Revolutionary Guard Corps) ইজরাইল ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সৌদিআরবে অবস্থিত মার্কিন যুদ্ধ ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে। আমেরিকা ও ইসরাইল পাল্টা হামলা চালায়। এককথায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির পারদ ক্রমশ উর্ধ্বমুখী।
Advertisement
সেই যুদ্ধের আঁচ এসে পড়েছে বিশ্ব বাজারে। যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরান পারস্য উপসাগরের চারপাশে অবস্থিত আরব দেশগুলোতে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ায় স্টক এবং বন্ডগুলির মূল্য হ্রাস পাচ্ছে । অপরদিকে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায়, বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ডলার এবং সোনার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা গেছে বিশ্বব্যাপী তেলের ব্যরেলের দাম ১৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরদিকে এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড ইনডেক্স প্রায় ১.১% হ্রাস পেয়েছে।
Advertisement
আকাশপথে হামলার পাশাপাশি, ইরান হরমুজ প্রণালিতে তেলের ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব বাজারে তেলের যোগানে টান পড়েছে। কারণ, ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত থেকে আমদানিকৃত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশই (প্রায় ২০%) আসে এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। অপরদিকে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল করলে হামলার ঘোষণা করেছে ইরানের বন্ধুস্থানীয় ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। এরকম পরিস্থিতিতে, সোজা রাস্তা ছেড়ে ঘুরপথে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত হয়ে দেশে ঢোকা ছাড়া পথ নেই। এই পথে আমদানি বিলম্বিত হচ্ছে, সেই সাথে পরিবহন খরচাও বাড়ছে। সোজা কথায়, তেলের জোগানে টান পড়ায়, অপরিশোধিত তেলের ব্যারেলের দাম উর্ধ্বমুখী। ৪ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১.৪% বেড়ে হয়েছে ৮২. ৫৩ ডলার।
একদিকে, যুদ্ধ থামার নাম গন্ধ নেই, অপরদিকে জ্বালানি জোগানের ঘাটতির সম্ভাবনা— এই দুই আশঙ্কায় ধস নেমেছে শেয়ার বাজার। নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই) হোক বা বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএসই), দুই বাজারই নিম্নগামী। বিশ্বব্যাপী তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, হঠাৎ মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার কমানোর কোনো আশা না দেখতে পাওয়ায় শেয়ার সূচকগুলি দৃশ্যমান পতনের মুখে।
সাধারণত, উপসাগরীয় শেয়ার বাজারগুলি, তেলের দাম এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুদ্ধকালীন আবহাওয়ায় দিনশেষে সূচক লাল হয়ে যাচ্ছে। যেমন সৌদি আরবের প্রধান সূচকটি গত সোমবার ইন্ট্রাডে ২% ক্ষতির মুখ দেখে। অন্যদিকে কাতারে মিসাইল হানার পর বাজার আরও নিম্নগামী। সাধারণত তেলের দাম বেশি থাকলেও বিনিয়োগকারীরা যুদ্ধের ঝুঁকি, নিষেধাজ্ঞার পরিস্থিতি নিয়ে রীতিমতো উদ্বিগ্ন।
এদিকে ভারতের শেয়ার বাজার ও রক্তাক্ত৷ ২ মার্চ সেনসেক্স এক হাজার পয়েন্ট (১.২৯%) নেমে ৮০,২৩৪-এ পৌছায়, এবং নিফটি ১.২৪% হ্রাস পেয়ে ২৪,৮৬৫-এসে ঠেকে। পরেরদিন বাজারের অবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়-সেনসেক্স ১,৭৪১ পয়েন্ট (২.১৭%) এবং নিফটি ২৪,৩৫০-এর নিচে নেমে যায়। অতএব, বাজার যে ক্রমশ অনিশ্চিত অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে, তা স্পষ্ট।
এই সময়, মিড-ক্যাপ এবং স্মল-ক্যাপ কোম্পানি গুলি তীব্রভাবে সংশোধন করেছে। এরমধ্যেই, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করায় বাজারের মূলধন থেকে ১১ লক্ষ কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে; কেবলমাত্র দেশীয় কিছু স্টক কেনাবেচায় যুদ্ধকালীন এই পতন আংশিকভাবে প্রশমিত করা গেছে। এনএসই-এর সমস্ত সেক্টরই প্রায় রক্তাক্ত, কেবলমাত্র প্রতিরক্ষা সেক্টর ছাড়া ।
এমতাবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত?
এ ব্যাপারে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ধীরে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন: অযথা আতঙ্কিত হয়ে, এই মুহূর্তে সব শেয়ার বিক্রি না করাই ভালো, কারণ যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাজারগুলি প্রায়শই ধাক্কা খেয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। অন্তত, অতীতে তাই দেখা গেছে। তবে ব্যক্তিগত পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনতে সোনার প্রতি মনোনিবেশ করা যেতে পারে। পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন চলে তার ওপর; যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি নিয়ে বাজারে যে গভীর সংশোধন হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
Advertisement



