• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 30 October, 2026

ব্যাঙ্কের নিরাপত্তা অর্থনীতির ভরসা

আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়, ব্যবসায়ীর লেনদেন, কৃষকের উপার্জন কিংবা অবসরপ্রাপ্ত

ব্যাঙ্কের নিরাপত্তা অর্থনীতির ভরসা

আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়, ব্যবসায়ীর লেনদেন, কৃষকের উপার্জন কিংবা অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সারা জীবনের জমানো টাকা— সব কিছুর সঙ্গেই ব্যাঙ্কের সম্পর্ক। মানুষ ব্যাঙ্কে টাকা রাখেন এই বিশ্বাসে যে, সেখানে তাঁর অর্থ নিরাপদ থাকবে। সুদ পাওয়া, ঋণ নেওয়া কিংবা বিনিয়োগের পরামর্শ পাওয়ার মতো নানা সুবিধা থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাঙ্কের সবচেয়ে বড় পরিচয় হল নিরাপদ অর্থভান্ডার। সেই নিরাপত্তার জায়গাটিই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তা হলে গোটা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক।
দিল্লির কাছে গ্রেটার নয়ডার পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের একটি শাখায় সম্প্রতি প্রায় ৩৫ কোটি টাকার জালিয়াতির অভিযোগ সেই আশঙ্কাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। অভিযোগ, জমি বিক্রি করে যাঁরা কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করেছিলেন, সেই গ্রামীণ গ্রাহকদের স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে তাঁদের অজান্তেই অন্যের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় ব্যাঙ্কের কর্মীদের একাংশের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সত্য প্রমাণিত হলে একে নিছক আর্থিক অপরাধ বলে দেখলে চলবে না। এটি মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা।
এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত বছর রাজস্থানের কোটা শহরে একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের প্রাক্তন রিলেশনশিপ ম্যানেজারের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বর বদলে দিয়ে তিনি লেনদেনের খবর তাঁদের কাছে পৌঁছতে দেননি বলে অভিযোগ। ২০২৪ সালে দিল্লিতে একটি ব্যাঙ্কের শাখা ম্যানেজারের বিরুদ্ধে এক অনাবাসী ভারতীয়ের প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ভুয়ো অ্যাকাউন্ট তৈরি করে ডেবিট কার্ড ও চেকবইয়ের সাহায্যে টাকা সরানোর অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। আবার ২০২৩ সালে ব্যাঙ্ক অব বরোদার কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ৩৬২ জন গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে
অনুমতি ছাড়াই মোবাইল নম্বর যুক্ত করে প্রায় ২২ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
এই ঘটনাগুলির একটি বিশেষ দিক রয়েছে। এগুলি জটিল প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার অপরাধ নয়। ব্যাঙ্কের নিজস্ব কর্মী, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই এমন প্রতারণা সম্ভব হয়েছে। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একজন কর্মী নির্দেশ তৈরি করেন এবং অন্য একজন তা যাচাই করে অনুমোদন দেন। ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘মেকার-চেকার’ পদ্ধতি। কিন্তু দু’জনের যোগসাজশ থাকলে, দায়িত্ব পালনে অবহেলা হলে কিংবা পুরনো কর্মীর লগ-ইন পরিচয় অপব্যবহার করা হলে এই নিরাপত্তাব্যবস্থা অর্থহীন হয়ে পড়ে। জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য রাখা বিকল্প ব্যবস্থার অপব্যবহারও বিপদের কারণ হতে পারে।
সব ক্ষেত্রে অবশ্য প্রতারকদের উদ্দেশ্য একবারে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া নয়। অনেক সময় গ্রাহকের টাকা অন্যত্র বিনিয়োগ করে লাভ করার চেষ্টা চলে। আশা থাকে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা ফিরিয়ে দিলে কেউ কিছু বুঝতে পারবেন না। কিন্তু বিনিয়োগে লোকসান হলে কিংবা হিসাব মেলাতে না পারলে প্রতারণা প্রকাশ্যে আসে। আবার ব্যাঙ্কের কর্মীদের উপর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপও কখনও কখনও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে। নতুন গ্রাহক সংগ্রহ বা মোবাইল ব্যাঙ্কিং পরিষেবা চালু করার তাগিদে নিয়মবহির্ভূত কাজের পথ খুলে যেতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই ধরনের প্রতারণার শিকার হন সাধারণত আর্থিক বিষয়ে কম অভিজ্ঞ মানুষ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নতুন ব্যাঙ্ক গ্রাহক, প্রবীণ নাগরিক এবং সদ্য জমি বিক্রি করে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা পাওয়া পরিবারগুলি সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠেন। তাঁদের অনেকেই ব্যাঙ্কের কর্মীদের উপর ব্যক্তিগত আস্থা রাখেন। কাগজপত্রের ভাষা বা ডিজিটাল লেনদেনের জটিলতা সব সময় বুঝতে পারেন না। ফলে ব্যাঙ্কের ভিতরের কোনও কর্মীই যখন প্রতারণা করেন, তখন তাঁদের পক্ষে বিপদ আঁচ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কথা ঠিক যে, জালিয়াতির ঘটনায় অনেক সময় ব্যাঙ্ক ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহককে টাকা ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু টাকা ফেরত পেলেই ক্ষতি পূরণ হয় না। দীর্ঘদিনের বিশ্বাসে ফাটল ধরে। ভবিষ্যতে মানুষ ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে ভয় পেলে তার প্রভাব পড়বে সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উপরও।

তাই শুধু ঘটনার পরে ক্ষতিপূরণ দিলেই ব্যাঙ্কের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। প্রতিটি বড় লেনদেনে স্বাধীনভাবে যাচাই, গ্রাহকের মোবাইলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা, অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত নম্বর বদলের ক্ষেত্রে কঠোর অনুমোদন এবং কর্মীদের লগ-ইন ব্যবহারের নিয়মিত নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাহকের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থাও থাকা জরুরি। একই সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের আর্থিক পরিষেবা বিভাগকে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।