সীমান্ত অঞ্চলের রাজনীতি বদলালে তাকে শুধু মতাদর্শের পালাবদল বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। সীমান্তে আসল প্রশ্নটা অন্য। সেখানে কে উপস্থিত, কে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, আর কে সেই শূন্যতা ভরাট করে, এই প্রশ্নগুলিই বড়। আর সীমান্তবর্তী মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার প্রতি রাজধানীর মনোযোগ যে কম থাকে, তা অস্বীকার করার নয়।
বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলিতে সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর অগ্রগতি অনেকের চোখে মতাদর্শগত উত্থান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি মূলত প্রান্তিক মানুষের অসন্তোষের প্রকাশ।
Advertisement
রংপুর, রাজশাহী কিংবা খুলনা— এই অঞ্চলগুলি বহুদিন ধরেই উন্নয়নের মূল ধারার বাইরে পড়ে আছে। শিল্পায়ন সীমিত, কর্মসংস্থানের সুযোগ কম, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো দুর্বল। তরুণদের বড় অংশ কাজের খোঁজে রাজধানী বা বিদেশমুখী। এই বাস্তবতায় যে সংগঠন নিয়মিত মানুষের কাছে যায়, ত্রাণ দেয়, স্কুল চালায়, সংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে— তাদের প্রভাব বাড়াই স্বাভাবিক।
Advertisement
জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির লড়াই-ই মুখ্য আলোচ্য। কিন্তু ঢাকার শক্তি সীমান্তের আস্থায় সবসময় রূপান্তরিত হয় না। প্রান্তিক মানুষ যখন মনে করেন, তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলি, যেমন রাস্তা, সেচ, হাসপাতাল, স্থানীয় কাজের সুযোগ ইত্যাদি নিয়ে প্রশাসন যথেষ্ট সক্রিয় নয়, তখন বিকল্প শক্তির প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। সেখানে বড় রাজনৈতিক ভাষণের চেয়ে নিয়মিত উপস্থিতিই বেশি মূল্য পায়।
ভারতের দিক থেকেও এই পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই স্পর্শকাতর। দীর্ঘ সীমান্ত, অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক, নাগরিকপঞ্জির প্রশ্ন— এসব মিলিয়ে সীমান্তে কোনও ইসলামপন্থী দলের উত্থানকে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা থাকবেই। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মতো রাজ্যে এই বিষয়টি রাজনৈতিক আবেগের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু অতিরিক্ত আতঙ্ক বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করতে পারে। এখন পর্যন্ত যে চিত্র সামনে এসেছে, তা সর্বগ্রাসী মতাদর্শের নয়; বরং স্থানীয় মানুষের অসন্তোষের রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ।
ঢাকার জন্য এটি আত্মসমালোচনার মুহূর্ত। সীমান্ত অঞ্চলকে প্রায়শই নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে দেখা হয়, উন্নয়নের অগ্রাধিকারের তালিকায় নয়। অথচ সীমান্তকে স্থিতিশীল রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল সেখানে কাজের সুযোগ বাড়ানো, পরিকাঠামো উন্নত করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। মানুষ যদি দেখে, তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসছে, তবে বিকল্প শক্তির প্রতি আকর্ষণও স্বাভাবিকভাবে কমে।
নয়াদিল্লির কাছেও বার্তাটি পরিষ্কার। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বাণিজ্য ও নিরাপত্তার সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কিন্তু সীমান্ত শুধু চুক্তি বা টহলদারির মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। সীমান্তবাসীর আস্থা, জীবিকা ও দৈনন্দিন নিরাপত্তাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতি নির্ধারণ করে।
সব মিলিয়ে, সীমান্তের এই বার্তা মতাদর্শের চেয়ে অনেক বেশি প্রশাসন ও উন্নয়নের। প্রান্তকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে, প্রান্তই একসময় নিজের রাজনৈতিক পথ বেছে নেয়। সেই পথ রাজধানীর অঙ্ক মেনে চলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই সীমান্তের পরিবর্তনকে আতঙ্ক নয়, সতর্কবার্তা হিসেবে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
Advertisement



