আসামে বন্যা নতুন কিছু নয়। বহু প্রজন্ম ধরে ব্রহ্মপুত্র নদ এই রাজ্যের ভূগোল, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিকে গড়ে তুলেছে। প্রতি বছর বর্ষায় নদী উপচে পড়ে, কখনও উর্বর পলি এনে জমিকে সমৃদ্ধ করে, আবার কখনও ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। কিন্তু যখন একটি বন্যাকে ‘দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ’ বলা হয়, তখন তাকে আর সাধারণ প্রাকৃতিক চক্রের অংশ হিসেবে দেখলে চলবে না। তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে— আমরা কি এমন এক ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত, যেখানে বন্যা আরও ঘন ঘন, আরও তীব্র এবং আরও ব্যয়বহুল হবে?
প্রতিবার বড় বন্যার পর আমাদের দৃষ্টি থাকে উদ্ধারকাজ এবং ত্রাণের উপর। কত দ্রুত মানুষকে সরানো হল, কত খাদ্য বা ওষুধ পৌঁছল— এসবই তখন সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রচেষ্টা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলার আসল পরীক্ষা শুরু হয় বন্যার জল নামার পর। তখন ভাঙা বাড়ি আবার গড়ে তুলতে হয়, চাষের জমি থেকে পলি সরিয়ে নতুন করে চাষ শুরু করতে হয়, রাস্তা-ঘাট মেরামত করতে হয়, স্কুল খুলতে হয়, আর মানুষকে আবার জীবিকার পথে ফিরতে হয়। দরিদ্র মানুষের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি শুধু সাময়িক নয়— অনেক সময় কয়েক বছরের সঞ্চয় মুহূর্তে শেষ হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে, ফলে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ছে। আসামের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও জটিল। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদী, অতিরিক্ত পলি জমা, প্রাকৃতিক জলনিকাশের পথ সংকুচিত হওয়া, উজানে বনভূমি ধ্বংস এবং পুরনো বাঁধ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে বন্যা শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি একাধিক সমস্যার মিলিত ফল।
এই কারণেই শুধু জরুরি ত্রাণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নদী ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, জলনিকাশের পথ পুনরুদ্ধার করা, পরিবেশ সংরক্ষণ, এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ— এই সবকিছুকে একসঙ্গে ভাবতে হবে। পাশাপাশি দরকার এমন বাড়িঘর নির্মাণ, যা বন্যা সহনীয়, এবং স্থানীয় স্তরে শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলা।
ভারত ইতিমধ্যে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় যথেষ্ট উন্নতি করেছে। এর ফলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু শুধু প্রাণ বাঁচানোই যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, মানুষ বন্যার পর কত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে। যদি প্রতি বছর বন্যার পর মানুষ আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে যায়, তবে সেই উন্নয়ন মজবুত নয়।
আসামের বন্যার প্রভাব শুধু ওই রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সরবরাহ চক্র ভেঙে পড়ে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে সরকারের উপর আর্থিক চাপও বাড়ে। যদি এভাবে প্রতি বছর বড় অঙ্কের অর্থ শুধু ত্রাণ ও পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি করবে।
তাই এখনই সময় দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। বন্যাকে শুধু বার্ষিক দুর্যোগ হিসেবে না দেখে, জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ত্রাণের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিতে হবে প্রতিরোধ ও অভিযোজন ব্যবস্থায়। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় জনগণ— সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আসামের বন্যা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে— আমরা কি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত? যদি এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আজকের আঞ্চলিক সমস্যা আগামী দিনে জাতীয় সংকটে পরিণত হতে পারে। তাই সময় থাকতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়াই একমাত্র পথ।




