সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)-র ত্রিভাষিক নীতি আজকের ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষা কেবল বইয়ের জ্ঞান নয়; শিক্ষা মানুষের মননকে মুক্ত করে, সৃজনশীলতাকে বিকশিত করে এবং সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বহু অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং ছাত্রছাত্রী মনে করছেন যে, নতুন নতুন শিক্ষানীতির নামে শিশুদের উপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে সিবিএসই-র ত্রিভাষিক নীতি অনেক ক্ষেত্রেই আশীর্বাদের বদলে এক মানসিক যন্ত্রণা ও বিভ্রান্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
ভারত ভাষাগত বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। এখানে শত শত ভাষা, উপভাষা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সহাবস্থান করে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা মানুষের আবেগ, ইতিহাস, সাহিত্য এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এমন একটি সংবেদনশীল ক্ষেত্রে শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় অত্যন্ত সতর্কতা, বাস্তববোধ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ত্রিভাষিক নীতির বাস্তব প্রয়োগে সেই সংবেদনশীলতা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
মূলত এই ত্রিভাষিক নীতির উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় সংহতি বৃদ্ধি করা এবং ছাত্রছাত্রীদের বহু ভাষায় দক্ষ করে তোলা। সাধারণভাবে একজন শিক্ষার্থীকে মাতৃভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা, হিন্দি এবং ইংরেজি শিখতে হবে— এই ধারণার উপর ভিত্তি করে নীতিটি তৈরি হয়। হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে আবার দক্ষিণ ভারতের একটি ভাষা শেখানোর কথাও বলা হয়েছিল। কাগজে-কলমে এই পরিকল্পনা যথেষ্ট সুন্দর ও আদর্শবাদী মনে হলেও বাস্তবে তা বহু ক্ষেত্রে জটিল, চাপপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছাত্রছাত্রীরাই। বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই বিশাল সিলেবাস, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, কোচিং সংস্কৃতি, ডিজিটাল বিভ্রান্তি এবং অভিভাবকদের প্রত্যাশার চাপের মধ্যে বেড়ে উঠছে। তার উপর একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জনের বাধ্যবাধকতা তাদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যে ছাত্র বিজ্ঞান, গণিত, সাহিত্য, সংগীত বা খেলাধুলায় অসাধারণ প্রতিভা দেখাতে পারত, সে আজ ব্যাকরণ, শব্দার্থ, অনুবাদ এবং অজানা ভাষার নিয়ম মুখস্থ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে শিক্ষা আনন্দের বিষয় না হয়ে আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নীতিনির্ধারকেরা প্রায়শই ছাত্রছাত্রীদের বাস্তব মানুষ হিসেবে না দেখে পরিসংখ্যানের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করেন। মহানগরের কোনো সচ্ছল পরিবারের ছাত্র হয়তো ব্যক্তিগত শিক্ষক, ডিজিটাল সুবিধা এবং শিক্ষিত পরিবেশের কারণে সহজে বহুভাষিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র পরিবার, আদিবাসী সমাজ, পরিযায়ী শ্রমিকের সন্তান বা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বা দুটি ভাষাই যথেষ্ট কঠিন। সেখানে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করা শিক্ষাগত বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই শিক্ষাব্যবস্থার মানসিক প্রভাবও উদ্বেগজনক। উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা, পরীক্ষাভীতি এবং মানসিক ক্লান্তি আজকের ছাত্রছাত্রীদের সাধারণ সমস্যা হয়ে উঠেছে। শিক্ষাব্যবস্থা যেন ভুলে যাচ্ছে যে শিশুরা কোনও যন্ত্র নয়। তাদের জীবনে খেলাধুলা, কল্পনা, আনন্দ, বন্ধুত্ব এবং মানসিক সুস্থতার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত হোমওয়ার্ক, ভাষা-প্রকল্প এবং পরীক্ষার চাপে তাদের শৈশব ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
ত্রিভাষিক নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হল এর ব্যবহারিক প্রাসঙ্গিকতা। ইংরেজি আজ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং উচ্চশিক্ষার বিশ্বজনীন ভাষা। মাতৃভাষা মানুষের সাংস্কৃতিক শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখে।
কিন্তু বহু অভিভাবক প্রশ্ন তুলছেন— যে তৃতীয় ভাষা ছাত্রছাত্রী বাস্তব জীবনে কখনও ব্যবহারই করবে না, সেই ভাষা বাধ্যতামূলকভাবে শেখানোর প্রকৃত লাভ কী? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছাত্রছাত্রীরা ভাষা শেখে শুধুমাত্র পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য; পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সেই ভাষার প্রতি আগ্রহও শেষ হয়ে যায়।
ভারতে ভাষা বরাবরই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। বিশেষ করে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে ভাষাগত আধিপত্যের আশঙ্কা বহু পুরনো। দক্ষিণ ভারতে ভাষা আন্দোলন রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেকেই মনে করেন, ত্রিভাষিক নীতির আড়ালে কিছু ভাষাকে অন্য ভাষার তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। শিক্ষা যদি বিভাজনের কারণ হয়ে ওঠে, তবে তার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়।
শিক্ষকদের অবস্থাও খুব সহজ নয়। বহু স্কুলে দক্ষ ভাষাশিক্ষকের অভাব রয়েছে। বিশেষত গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষার উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া কঠিন। ফলে ভাষা শিক্ষা প্রায়ই যান্ত্রিক মুখস্থবিদ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে। ছাত্রছাত্রীরা ভাষার সাহিত্যিক সৌন্দর্য বা যোগাযোগের আনন্দ উপলব্ধি করতে পারে না; তারা শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অংশ মুখস্থ করে।
অভিভাবকদের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। তাঁরা অনুভব করছেন যে শিক্ষাব্যবস্থা যেন এক বিশাল পরীক্ষাগার, যেখানে প্রতি কয়েক বছর অন্তর নতুন নতুন সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হয়। কখনও নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, কখনও নতুন সিলেবাস, কখনও আবার নতুন ভাষানীতি। এই অবিরাম পরীক্ষানিরীক্ষা ছাত্রছাত্রী এবং বিদ্যালয়— উভয়কেই বিভ্রান্ত করছে।
বেসরকারি স্কুলগুলি অনেক সময় বহুভাষিক শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। অভিভাবকদের বোঝানো হয় যে, বেশি ভাষা জানা মানেই বেশি মেধাবী হওয়া। ফলে ব্যয়বহুল কোচিং, ভাষা-টিউশন এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রীর পেছনে পরিবারগুলিকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। শিক্ষা ক্রমশ অর্থনৈতিক বৈষম্যের ক্ষেত্রেও পরিণত হচ্ছে।
এই বিতর্কের গভীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্ন রয়েছে— শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? সব ছাত্রছাত্রীকে একই ছাঁচে ফেলা, নাকি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র প্রতিভাকে বিকশিত করা? কেউ ভাষা শেখায় দক্ষ হতে পারে, আবার কেউ গণিত, সংগীত, শিল্প, খেলাধুলা বা প্রযুক্তিতে অসাধারণ প্রতিভা দেখাতে পারে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যেন সকলের উপর একই প্রত্যাশা চাপিয়ে দিতে চাইছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীও স্থানীয় বাস্তবতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে শিক্ষার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিক্ষানীতির অনেক ক্ষেত্রেই সেই মানবিকতা অনুপস্থিত। শিক্ষা ক্রমশ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং মানকীকরণের প্রকল্পে পরিণত হচ্ছে।
ডিজিটাল যুগে ভাষার অর্থও বদলে গেছে।
অনুবাদ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বহুভাষিক সফটওয়্যার ভাষাগত বাধা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক মুখস্থভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও উঠছে। ভাষা শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা হওয়া উচিত আনন্দময়, নমনীয় এবং বাস্তবমুখী।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হল গভীর শিক্ষার অভাব। অতিরিক্ত বিষয় এবং ভাষার চাপে ছাত্রছাত্রীরা কোনো বিষয়েই গভীর দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।
তাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় শুধুমাত্র পরীক্ষায় পাশ করা। ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং চিন্তার জগতের দরজা খুলে দেওয়ার বদলে পরীক্ষার ভয়ের বিষয় হয়ে ওঠে।বিশেষ করে বোর্ড পরীক্ষার সময় এই চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল, আইন বা অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত ভাষা বিষয় প্রায়শই অপ্রয়োজনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বহু ছাত্রছাত্রী ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করে যে তারা ভাষা শেখে আগ্রহ থেকে নয়, বরং নম্বর হারানোর ভয়ে।
‘ছাত্রছাত্রীরা গিনিপিগ হয়ে উঠছে’— এই কথার মধ্যে এক গভীর সামাজিক হতাশা লুকিয়ে আছে। কোটি কোটি শিশুর জীবনে প্রভাব ফেলা শিক্ষানীতি প্রণয়নের আগে শিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী, অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অনেক সময় সেই আলোচনা ছাড়াই নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়।
অবশ্য বহুভাষিক শিক্ষার সম্পূর্ণ বিরোধিতা করাও যুক্তিযুক্ত নয়। বহু ভাষা শেখা দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করে, সাংস্কৃতিক সহনশীলতা বাড়ায় এবং জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করতে পারে। সমস্যা ভাষা শিক্ষায় নয়; সমস্যা জোরপূর্বক, অবাস্তব এবং অমানবিক প্রয়োগে। ভাষা শেখা আনন্দ, সাহিত্য, সংগীত, নাটক এবং বাস্তব যোগাযোগের মাধ্যমে হওয়া উচিত— ভয় এবং চাপের মাধ্যমে নয়।
তাই আজ প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং মানবিক শিক্ষানীতির। ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ, সক্ষমতা, আঞ্চলিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিয়ে ভাষা শেখার স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। শিক্ষা এমন হওয়া উচিত যা আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, ভয় নয়।
ভারতের ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে আগামী প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা এবং মানবিক বিকাশের উপরও। যদি শিক্ষানীতি বাস্তবতা ও সহানুভূতির অভাবে তৈরি হয়, তবে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের এক বিশাল পরীক্ষাগারের অসহায় গিনিপিগ বলে মনে করবেই। শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক পরীক্ষা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক পবিত্র দায়িত্ব।




