নির্বাচন কমিশনের কাজ হওয়ার কথা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠা। অথচ সাম্প্রতিক যে নির্দেশ ও পাল্টা-নির্দেশের ঘূর্ণাবর্তে কমিশন নিজেই জড়িয়ে পড়ছে, তাতে সেই বিশ্বাস ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) শুনানিকে কেন্দ্র করে আধার কার্ড ও মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আধার কার্ডকে কার্যত ‘উধাও’ করে দেওয়া, আর এতদিন গ্রহণ করা নথিকে হঠাৎ বাতিল ঘোষণা— এই দুই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক বিভ্রান্তি নয়, সাধারণ মানুষের উপর এক নির্মম চাপও বটে।
প্রসঙ্গত, মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, সুপ্রিম কোর্ট এসআইআরে আধার কার্ডকে গ্রহণযোগ্য নথি হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশ মেনেই নির্বাচন কমিশন আধারকে তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, চুপিসারে সেই আধারকেই কার্যত অকেজো করে দেওয়া হচ্ছে। মৌখিক নির্দেশে ইআরওদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, শুনানিতে আধার দেখানো গেলেও তা ইসিআই নেটে আপলোড করা যাবে না। অর্থাৎ কাগজে-কলমে আধার ‘গ্রহণযোগ্য’, কিন্তু ডিজিটাল ব্যবস্থায় তার কোনও অস্তিত্ব নেই। এমন দ্বিচারিতা শুধু হাস্যকর নয়, গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
Advertisement
রাজ্যের বিভিন্ন জেলা— পূর্ব বর্ধমান, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ– থেকে যে ছবি উঠে আসছে, তা এক কথায় প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার দলিল। বুধবার পর্যন্ত যে নথি আপলোড করা যাচ্ছিল, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তা বন্ধ। না কোনও আগাম বিজ্ঞপ্তি, না কোনও লিখিত নির্দেশ। ইআরও, এইআরও, বিএলও সবাই অন্ধকারে। প্রশ্ন তুললে উত্তর নেই। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথা বললে নীরবতা। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
Advertisement
এর প্রভাব যে কতটা গভীর, তা বোঝা যায় মাঠের অভিজ্ঞতা থেকেই। বাবার নামের গরমিল, পারিবারিক পরিচয় সংক্রান্ত সন্দেহ— এই সব ক্ষেত্রে আধার কার্ডই ছিল বহু ভোটারের শেষ ভরসা। হঠাৎ সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ কার্যত ‘অপ্রমাণিত’ হয়ে পড়ছেন। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এ কি তবে নাগরিকত্ব নিয়ে পরোক্ষ সন্দেহ তৈরির প্রক্রিয়া? প্রশ্নটা অস্বস্তিকর হলেও অবান্তর নয়।
এর উপর আবার গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে এসেছে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড প্রসঙ্গ। বুধবার পর্যন্ত যে নথি শুনানিতে নেওয়া হয়েছে, বহু মানুষ যে নথি জমা দিয়েছেন, বৃহস্পতিবার হঠাৎই জানিয়ে দেওয়া হল যে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ওই নথি ১৩টি অনুমোদিত নথির তালিকায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, তাহলে এতদিন কেন তা নেওয়া হল? দিল্লিতে চিঠি লিখে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল, তার উত্তর না দিয়েই কমিশন একতরফা নির্দেশ জারি করল। এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মাশুল দেবে কে?
এখানে আসল সমস্যাটি কোনও একটি নথি গ্রহণ বা বর্জনের প্রশ্ন নয়। আসল সমস্যা হল সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি। মৌখিক নির্দেশ, লিখিত ব্যাখ্যার অভাব, মাঝপথে নিয়ম বদল—এই সব মিলিয়ে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের আচরণ ক্রমশ স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছে। নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে কোটি কোটি নাগরিকের যে মৌলিক অধিকার— ভোটাধিকার, তার উপর। সেখানে এমন হঠকারী আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বহু প্রবীণ মানুষের কথায় ধরা পড়ছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও হতাশা। যে আধারের জন্য একসময় রাত জেগে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে, শীত উপেক্ষা করতে হয়েছে, আজ সেই আধারই ‘অগ্রহণযোগ্য’। এই অপমান শুধু একটি নথির নয়, একটি প্রজন্মের, একটি নাগরিক সত্তার।
নির্বাচন কমিশনের উচিত অবিলম্বে স্পষ্ট ও লিখিত নির্দেশ জারি করা, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে আধার কার্ডকে পূর্ণ বৈধতা দেওয়া এবং ইতিমধ্যেই গৃহীত নথির ক্ষেত্রে পূর্বপ্রযোজ্য বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা। নইলে এসআইআর প্রক্রিয়া ‘সংশোধন’-এর বদলে পরিণত হবে এক গভীর গণতান্ত্রিক সংকটে। গণতন্ত্রের পাহারাদার যদি নিজেই তুঘলকি ফরমান জারি করে, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
Advertisement



