• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 30 October, 2026

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: জনমতে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা, প্রচারে ট্রাম্প ও ওবামা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে এবার যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা কেবল ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি ও বিরোধী

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: জনমতে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা, প্রচারে ট্রাম্প ও ওবামা

Image: Reuters via ANI

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে এবার যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা কেবল ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি ও বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে আসন দখলের লড়াই নয়। এই নির্বাচন হয়ে উঠেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসন, তাঁর অর্থনৈতিক নীতি এবং আমেরিকার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিশা নিয়ে জনমতের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকতে জাতীয় জনমত সমীক্ষায় ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে। অথচ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে সেনেটের লড়াই এখনও হাড্ডাহাড্ডি। ফলে নির্বাচনের আগে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে ট্রাম্প যেমন প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তেমনই বিরোধীদের শক্তি বাড়াতে মাঠে নেমেছেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ পায় না। কিন্তু মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব যথেষ্ট। প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সেনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনের জন্য ভোট হয়। রাজ্য ও স্থানীয় স্তরেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে চলে গেলে প্রেসিডেন্টের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এবারের নির্বাচন ট্রাম্পের কাছে শুধু কয়েকটি আসন রক্ষার
প্রশ্ন নয়, তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেরও পরীক্ষা।
২২ থেকে ২৬ অক্টোবরের রয়টার্স-ইপসোস সমীক্ষা অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৪৭ শতাংশ, রিপাবলিকানদের ৩৬ শতাংশ। অনিশ্চিত ভোটারদের সম্ভাব্য ঝোঁক হিসাবের মধ্যে আনলে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৫০ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় স্তরে বিরোধীরা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।
এই পরিসংখ্যানকে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে বিচার করতে হবে। জাতীয় ভোটের সমীক্ষায় এগিয়ে থাকা মানেই সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়া নয়। কারণ প্রতিটি রাজ্যের নির্বাচনী সমীকরণ আলাদা। কোথাও দলীয় আনুগত্য শক্তিশালী, কোথাও প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বড় ভূমিকা নেয়, আবার কোথাও অল্প কয়েক হাজার ভোটেই ফল বদলে যেতে পারে। তা সত্ত্বেও জাতীয় স্তরে ডেমোক্র্যাটদের এই ব্যবধান রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের কারণ।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, ট্রাম্পের কাজের প্রতি অনুমোদনের হার সামান্য বেড়ে ৩২ শতাংশ হলেও আমেরিকার ৭৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করছেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিস্থিতি ভুল পথে এগোচ্ছে। এখানেই নির্বাচনের মূল রাজনৈতিক সংকট। সাধারণ ভোটারের কাছে রাজনৈতিক বক্তৃতা, দলীয় আনুগত্য কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম, জ্বালানি খরচ এবং সংসার চালানোর সামর্থ্য অনেক বেশি জরুরি।
কোনও প্রশাসন যদি মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে না পারে, তাহলে তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক। ট্রাম্পের প্রচারে জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি এবং তেল-গ্যাস উৎপাদনে মিথেন নিঃসরণ সংক্রান্ত পূর্ববর্তী বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা তাই নিছক পরিবেশ বা জ্বালানি নীতির বিষয় নয়; এগুলি ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ প্রশমিত করার কৌশলও।
দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে এবার সেনেটের লড়াই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো এবং রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত কাছাকাছি। ১৯৮৮ সালের পর থেকে টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটরা সেনেট নির্বাচনে জিততে পারেনি। সেই রাজ্যে এবার তাদের সম্ভাবনা তৈরি হওয়া রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প সাত সপ্তাহের মধ্যে চারবার টেক্সাস সফর করেছেন বলে প্রচারের খবর থেকে জানা যাচ্ছে। এই ঘনঘন সফরকে রিপাবলিকানদের উদ্বেগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে আগাম ভোটে রিপাবলিকানদের এগিয়ে থাকা মানেই শেষ পর্যন্ত তাঁদের জয় নিশ্চিত নয়।
কানসাসের পরিস্থিতিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। ১৯৩২ সালের পর থেকে এই রাজ্যটি সেনেটে কোনও ডেমোক্র্যাটকে নির্বাচিত করেনি। কিন্তু এবার রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম হ্যামিলটনের লড়াই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সেখানে প্রচারে যাওয়া প্রমাণ করে, রিপাবলিকান নেতৃত্ব একাধিক তথাকথিত নিরাপদ আসন নিয়েও নিশ্চিন্ত নয়।
মিশিগানেও আবদুল এল-সায়েদ ও মাইক রজার্সের লড়াই নজর কাড়ছে। এই রাজ্যগুলির গুরুত্ব এখানেই যে, রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনও দল যখন নিজের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিতেও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে, তখন তা বৃহত্তর জনমতের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। যদিও কয়েকটি আসনের সমীক্ষা দিয়ে গোটা দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিশ্চিতভাবে ঘোষণা
করা যায় না।
ট্রাম্পের প্রচারে যেমন অর্থনীতি ও জ্বালানির প্রশ্ন প্রাধান্য পাচ্ছে, তেমনই তাঁর প্রশাসনের নীতিগুলিকে সামনে রেখে বিরোধীরা ভোটারদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। টেক্সাসে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং ভেনেজুয়েলাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার প্রসঙ্গ তোলার মতো মন্তব্য প্রচারের আলোচনায় এসেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্তি প্রদর্শনের বক্তব্য ঘরোয়া অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কতটা আড়াল করতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে, জর্জিয়ায় প্রচারে নামছেন বারাক ওবামা। তাঁর সঙ্গে থাকবেন ডেমোক্র্যাট সেনেটর জন অসফ এবং গভর্নর পদপ্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস। কমলা হ্যারিসও সেখানে তিন দিনের সফর শুরু করছেন। জর্জিয়া ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে গিয়েছিল। সেই রাজ্যে ডেমোক্র্যাট নেতাদের সক্রিয় প্রচার তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
ওবামার জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনী প্রচারে তাঁর অভিজ্ঞতা ডেমোক্র্যাটদের ভোটারদের উৎসাহিত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে জনপ্রিয় নেতার উপস্থিতিই জয়ের নিশ্চয়তা নয়। প্রচারের উত্তেজনাকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতিতে রূপান্তরিত করা এবং অনিশ্চিত ভোটারদের সমর্থন আদায় করাই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ওহাইও, আইওয়া, টেক্সাস ও কানসাসের মতো রাজ্যে লড়াইয়ের ফল নির্ধারণে অল্প ভোটের ব্যবধান বড় ভূমিকা নিতে পারে। বিপুল প্রচারব্যয় সত্ত্বেও কোনও প্রার্থী জিতবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি, শুল্কনীতি এবং ইরানকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যুদ্ধের মতো বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা বোঝার চেষ্টা চলছে। অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি আলাদা ক্ষেত্র হলেও বাস্তবে এগুলির মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন, পণ্য উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের সংসার খরচে। ফলে আন্তর্জাতিক নীতির রাজনৈতিক মূল্যও শেষ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ জীবনে গিয়ে মাপা হয়।
সব মিলিয়ে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ডেমোক্র্যাটরা জাতীয় জনমতে এগিয়ে থাকলেও তাঁদের সামনে চ্যালেঞ্জ হল এই সমর্থনকে নির্দিষ্ট আসনে জয়ে পরিণত করা। অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের জন্য প্রধান কাজ হবে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের জবাব দেওয়া এবং নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে ভোটারদের আস্থা
ধরে রাখা।