• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 9 July, 2026

ফান্ডের ভারসাম্যের গুণেই শেয়ার বাজারে লক্ষ্মীর আগমন

বিনিয়োগকারী হিসেবে SIP বা এককালীন যেভাবেই বিনিয়োগ করুন না কেনো নজর দেবেন হাইব্রিড ইকুইটি ফান্ডগুলির দিকে। বাজারের পতনে একদিকে এই ফান্ডগুলো যেমন বিনিয়োগকারীর মূলধনকে রক্ষা করে তেমনি আবার বাজারের উত্থানের সময় এই ফান্ড গুলির ইকুইটি অংশ বেড়ে গিয়ে বিনিয়োগকারীকে ভালো মুনাফার সন্ধান দেয়।

ফান্ডের ভারসাম্যের গুণেই শেয়ার বাজারে লক্ষ্মীর আগমন

Photo: File Photo

গত কয়েক সপ্তাহ পর পর ভারতের শেয়ার বাজার একের পর এক বাধা অতিক্রম করে ক্রমাগতভাবে উপরে বন্ধ হয়েছে। এর একটা অন্যতম প্রধান কারণ অবশ্যই অপরিশোধিত তেলের দামের অস্বাভাবিক পতন। গত শুক্রবার ব্যারেল পিছু অপরিশোধিত তেলের দাম বন্ধ হয়েছে ৭২ ডলারের আশেপাশে, ভারতের মতো তেল আমদানিকারী দেশগুলির কাছে এটি একটি বিশেষ সুসংবাদ। সম্প্রতি সৌদি আরব ঘোষণা করেছে এশিয়ান কান্ট্রিগুলিকে তারা অনেকটাই ডিসকাউন্টে তেল সরবরাহ করবে। এর ফলে ভবিষ্যতে আমাদের দেশেও তেলের দাম কমতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে মুদ্রাস্ফীতি থাকবে নিয়ন্ত্রণে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সুদ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারের উত্থান। ফলে বিনিয়োগকারীর সেন্টিমেন্ট হয়েছে পজেটিভ। বেশ কয়েক সপ্তাহ পরপর পতনের পরে তথ্য প্রযুক্তির শেয়ারগুলি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গত সপ্তাহে সব থেকে বেশি উজ্জ্বল হয়েছে ফার্মা এবং রিয়েলিটি সেক্টরের সূচকগুলি। কিন্তু পিএসইউ, ব্যাঙ্ক, এনার্জি সেক্টরের পারফরমেন্স বিনিয়োগকারীকে হতাশ করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিক্রির পরিমাণ কমালেও দেশীয় বিনিয়োগকারীরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে এই পরিস্থিতিতে। গত সপ্তাহে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার মতো কিন্তু দেশীয় বিনিয়োগকারীদের কেনার পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬০০কোটি টাকার মতো। ইউরোপিয়ান দেশগুলির অনেকেরই সূচক সর্বোচ্চ উচ্চতাকে ছুঁয়েছে। আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান দুই সূচক সেন্সেক্স এবং নিফটি প্রায় ০.৮% মতো বৃদ্ধি পেয়েছে গত সপ্তাহে। ব্যাঙ্কের সূচক কিছুটা ঢিলে থাকলেও মিডক্যাপ সূচকের পারফরম্যান্স ছিল মোটের উপর ভালো।

গত সপ্তাহে স্মল ক্যাপের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো, স্মল ক্যাপের সূচক প্রায় ২ শতাংশ উপরে বন্ধ হয়েছে, এর ফলে বাজারের বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্লোবাল ইনডেক্সগুলির মধ্যে আমেরিকার প্রধান দুই সূচক NASDAQ এবং DOWJONES বেশ কিছুটা উপরে বন্ধ হয়েছে। টেকনোলজি সেক্টরের পারফরমেন্স ছিলো বেশ ভালো।
অনেক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য গত কয়েক সপ্তাহের তথ্যপ্রযুক্তি শেয়ারের ক্রমাগত পতনকে সুযোগ হিসেবে নেওয়ার জন্য মতামত দিয়েছেন। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে আবার সাময়িক সমস্যা অতিক্রান্ত করতে পারলে এই সেক্টরে হবে নতুন সূর্যোদয়। গত সপ্তাহের থেকে টাকার দাম কিছুটা বেড়ে বন্ধ হয়েছে ৯৪.২১ ডলারে। টাকার দামের স্থিতিশীলতা বাজারে এনেছে স্বস্তির হাওয়া।

গত সপ্তাহের শেষে INDIAVIX বন্ধ হয়েছে প্রায় ১১ এর কাছে, এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীকে যোগাবে আত্মবিশ্বাস। ভারতের অর্থনীতির দৃঢ়তার আর এক প্রমাণ জিএসটির কালেকশন। জুন মাসে জিএসটি সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় ১.৯৫ লক্ষ কোটি টাকার মতো। যা আগের বছরের থেকে প্রায় ১৪ শতাংশ বেশী। এই তথ্য ভারতবর্ষের অর্থনীতি যে শক্তিশালী ভিতের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে তা প্রমাণ করে। সম্প্রতি জিএসটির রেট কমানোর সত্বেও ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালে জিএসটির সংগ্রহের পরিমাণ ডবল হয়েছে। ২০১৯ সালে জিএসটি সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ১১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকা ২০২৬ সালের তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩.১২ লক্ষ কোটি টাকার মতো। এই পরিসংখ্যান ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক শক্তির ইঙ্গিত।

গত সপ্তাহে খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আমেরিকা। তাদের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস ছিল ৪ জুলাই। ট্রাম্পের লম্বা-চওড়া ভাষণ কিন্তু আকর্ষিত করতে পারেনি বিনিয়োগ-কারীদের। একদিকে যেমন আমেরিকার বেকারত্বের হার সর্বনিম্ন হওয়াকে সাফল্যের রূপরেখা হিসেবে ধরলে, অন্য দিকে তেমনি দেশটির মোট ধারের পরিমাণ বর্তমানে সর্বোচ্চ যা প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার, গলার কাঁটার মতো বিঁধে আছে আমেরিকান অর্থনীতিতে। শান্তি চুক্তি কেমন হবে, কিম্বা ভবিষ্যতে যুদ্ধের সম্ভাবনা আছে কিনা সেই সম্পর্কেও একমত নন অনেক বিশেষজ্ঞ। যদিও ফ্রান্সের রণ তরী হরমুজ প্রণালী থেকে ফিরিয়ে নেওয়াকে যুদ্ধ বন্ধের উজ্জল সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক মহল। OPEC+ এর প্রধান সদস্য দেশগুলি সম্মতি জানিয়েছে তারা প্রতিদিন ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ব্যারেল তেল অতিরিক্ত উৎপাদন করবে পরের মাসের জন্য। ফলে তেলের দাম আসতে পারে আরেকটু নিচে। সোনা এবং রুপো এই দুই মূল্যবান ধাতুর দাম সাপ্তাহিক বন্ধের ভিত্তিতে বেশ কিছুটা উপরে বন্ধ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত সোনার দামের পতনে সুযোগ নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত এই মূল্যবান ধাতুটির ওপর।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে , ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং মাইক্রো ইকনোমিক্যাল ফ্যাক্টরের পরিবর্তনের জন্য আগামী দিনে ভারতের অর্থনীতি হবে অনেক শক্তিশালী ফলে বাজার বাড়বে। তাই বাজারের পতনের সুযোগ নিয়ে বিনিয়োগকারীকে বপন করতে হবে সঠিক বিনিয়োগের বীজ। নিজে সব দিক সামলাতে না পারলে সাহায্য নেবেন বিশেষজ্ঞের।

বর্তমানে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী ও সোনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ফিজিক্যাল গোল্ড অপেক্ষা ETF কিম্বা ফান্ড অফ ফান্ডকে বেছে নিয়েছে তাদের বিনিয়োগের মাধ্যমে যাবে। সম্প্রতি বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডের ডাটা এই কথাই বলে। বিভিন্ন ফান্ড অফ ফান্ডের দৌলতে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ও সোনায় এসআইপি (সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান)-এর মাধ্যমে বুনতে শুরু করেছে ভবিষ্যতের স্বপ্নের জাল। বন্ড পোর্টফোলিওর দিক থেকে বলতে গেলে G-SEC-এর পরিমাণ বাড়ানোর জন্য অনেক বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়েছেন। ইকুইটির সঙ্গে বন্ডের কম্বিনেশনে দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে বিনিয়োগকারী পেয়েছেন ভালো মুনাফার সন্ধান। তার প্রমাণ বিভিন্ন আগ্রাসিভ হাইব্রিড ইকুইটি ফান্ডগুলি। অনেকের ধারণা এগ্রেসিভ হাইব্রিড ইকুইটি ফান্ড এসআইপির মাধ্যমে বিনিয়োগের উপযুক্ত নয়। কিন্তু তাদের প্রমাণকে মিথ্যে করেছে এই ফান্ডগুলির দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্স। সুতরাং বিনিয়োগকারী হিসেবে SIP বা এককালীন যেভাবেই বিনিয়োগ করুন না কেনো নজর দেবেন হাইব্রিড ইকুইটি ফান্ডগুলির দিকে। বাজারের পতনে একদিকে এই ফান্ডগুলো যেমন বিনিয়োগকারীর মূলধনকে রক্ষা করে তেমনি আবার বাজারের উত্থানের সময় এই ফান্ড গুলির ইকুইটি অংশ বেড়ে গিয়ে বিনিয়োগকারীকে ভালো মুনাফার সন্ধান দেয়। একেবারে অনেকটা বেড়ে বা কমে না গিয়ে ‘ছোট্ট ছোট্ট পায়ে’ সচল হয়ে বিনিয়োগকারীকে চাঁদের পাহাড়ের সন্ধান দেয়।