পাপিয়া চৌধুরী
বেশ অনেকদিন পর জ্ঞানমঞ্চে শ্রী ও সমৃদ্ধময় নান্দনিক এক অনুষ্ঠান দেখলাম। স্থাপনা শান্তিনিকেতন নিবেদিত ‘রঙ্গালয়ের রবি’। বাংলা সাধারণ রঙ্গমঞ্চ ও রবীন্দ্রনাথ। মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে নাট্টবেত্তা অরুন মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘মঞ্চে কাজ করাটা বড় পুণ্যের কাজ আমার।’ সকলের অনুরোধে দুটি গানও শোনালেন। ‘জগন্নাথ’ নাটকের ‘ও মনরে’ আর ‘মারীচ সংবাদ’-এর বিখ্যাত গান ‘মেরি বাবা’। এ যেন এক বাড়তি পাওয়া।
‘রঙ্গালয়ের রবি’র মূল ভাবনা ও ভাষ্য প্রকৃতি মুখোপাধ্যায়ের। রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তীর লেখা বই ‘সাধারণ রঙ্গালয় ও রবীন্দ্রনাথ’ পড়ে আগ্রহ হয় অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ করার। ১৮৮৬ থেকে ১৯৪১-এর মধ্যে কবির নাটক, গল্প, উপন্যাস, কবিতার নাট্যরূপ মিলিয়ে প্রায় পঁচিশটি প্রযোজনা উপস্থাপিত হয়েছিল সাধারণ রঙ্গমঞ্চে। সেই সময় কবির গান নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হয়। কীভাবে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি ও ব্রাহ্মসমাজের বাইরে রবীন্দ্রনাথের গান জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বা তখনকার বিভিন্ন নামি পত্রপত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে নানা নিবন্ধ, তথ্য ও রবীন্দ্রনাথের গানের কথা ও সুরের ক্রমোন্নয়ন, ইমপ্রোভাইজেশন সবই রয়েছে প্রকৃতির অণ্বেষনে। কাঠামো একইরকম থাকলেও কথা ও সুর পাল্টেছে, গায়নরীতি বদলেছে, আবার তখনকার বিভিন্ন নট-নটিদের কথাও জানা যায়। গবেষণাধর্মী সুচিন্তন, সংযত পারিপাট্যে মোড়া ছিল, বাদ যায়নি সেই সময়ের বহু আলোচিত নটি বিনোদিনী ছাড়াও আরও অনালোচিত নটি বেদানা দাসীর গানের কথাও। সাধুবাদ জানাতে হয় প্রকৃতি মুখোপাধ্যায়কে। তাঁর গানের গলাটিও চমৎকার! কণ্ঠের জোয়ার ও গমক, নিখাদ উচ্চারণ মন ও চিত্ত হরণ করে। বেদানা দাসীর কণ্ঠের গান (তখন ছিল রবিবাবুর গান) ‘আজ তোমারে দেখতে এলাম অনেক দিনের পরে’ প্রকৃতির সপ্রতিভ কণ্ঠ জোয়ার বহুকাল মনে থাকবে।
Advertisement
বিশুদ্ধ কণ্ঠে কোনও যন্ত্রাণুষঙ্গ ছাড়া ‘আঁধার রাতে একলা পাগল’ প্রকৃতির গায়কীতে অনন্যতা পায়। সেই সময় গাইতেন কৃষ্ণচন্দ্র দে, সবাই অন্ধ গায়ক বলতেন। শোনা যায়, ১৯২৩ সালে স্টার থিয়েটারে অহীন্দ্র চৌধুরী অভিনীত নাটক ‘রাজা ও রানি’ প্রযোজনায় ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিহাস নির্ভর প্রেক্ষাপটের জন্য নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ফরমায়েশ মতো পোশাক তৈরি করান, নিজে হাতে পাগড়িও বেঁধে দিতেন। সেই নাটকেরই গান শোনালেন প্রত্যুষ মুখোপাধ্যায়। কণ্ঠ মদিরায় মজালেন দর্শকদের। মধু বসুর লেখায় পাওয়া যায় ‘ডালিয়া’ নাটকের হারমোনাইজড গান-এর ব্যবহার। গুরুদেব শুনে বলেছিলেন, ‘উপযুক্ত হয়েছে’। প্রকৃতি ও প্রত্যুষ দ্বৈত কণ্ঠে শোনালেন, ‘আমি চঞ্চল হে’, সাধু পরিবেশনা। প্রত্যুষের দরাজ কণ্ঠে ‘চিরকুমার সভা’ নাটকের গান ‘কত কাল রবে’ বেশ মনোগ্রাহী। ভাষ্য কথনে সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের উচ্চারণ, গলার মডিউলেশন, বাচিক অভিনয়ের মাধুর্য্য ও ভাবাবেগের সুঠাম ব্যবহার এবং নবীনদের নিয়ে এগিয়ে চলার প্রবণতা বেশ সাধুবাদযোগ্য। ‘গোরা’ নাটকের একটি গান সুজয়ের কণ্ঠে ‘আলোকের এই ঝরনা ধারায় ধুইয়ে দাও’ বেশ লাগলো। গোরা নাটকের অন্য একটি গান প্রত্যুষের উদাত্ত কণ্ঠে ‘জয় হোক জয় হোক নব অরুণোদয়’ মন মাতিয়ে দেয়। প্রাককথনে ছিলেন রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, লেখক ড. পবিত্র সরকার।
Advertisement
শুরুটাই যদি মধুর হয়, মধুরেন সমাপয়েত তো হবেই। মঞ্চসজ্জাটিও ছিল নান্দনিক। এস্রাজে ঋতম বাগচী খুবই হৃদয়গ্রাহী, যথাযথ অনুষঙ্গে ছিলেন কিবোর্ডে সুরজিৎ দাশ ও তবলায় সুভাষ পাল এবং সঞ্চালনায় ছিলেন রিকিতা পরিহাল। সমগ্র অনুষ্ঠান তত্ত্বাবধানে ছিলেন মেহেন্দি চক্রবর্তী। অপেক্ষায় রইলাম এইরকম গবেষণাধর্মী, হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনার।
Advertisement



