পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে চলেছে। একই সঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে আরও আর্থিকভাবে শক্তিশালী করে লক্ষ লক্ষ মহিলাকে ‘লাখপতি দিদি’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে রাজ্য সরকার। বুধবার নবান্নে গ্রামোন্নয়ন সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচির কথা জানিয়ে এমনই বার্তা দেন পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ।
মন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কেন্দ্রীয় সহায়তাপ্রাপ্ত একাধিক গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প রাজ্যে পুনরায় চালু হয়েছে। গ্রামীণ কর্মসংস্থান, আবাসন, সড়ক নির্মাণ, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিভিন্ন কর্মসূচিতে নতুন করে গতি এসেছে। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সহায়তা রাজ্যে পৌঁছতে শুরু করেছে বলে তিনি জানান।
দিলীপ ঘোষ বলেন, “গ্রামের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, গৃহহীনদের জন্য আবাসন এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর আর্থিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে।”
গ্রামীণ সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে বড় ঘোষণা করে মন্ত্রী জানান, প্রায় ২ হাজার ৭৯০ কিলোমিটার নতুন গ্রামীণ রাস্তা এবং ৪৫টি সেতু নির্মাণের নীতিগত অনুমোদন মিলেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে।
একই সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচিও দ্রুত চালু করার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি জব কার্ডধারী মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইতিমধ্যে প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রশিক্ষণ এবং পরিকাঠামোগত প্রস্তুতির কাজ শেষ হয়েছে।
আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কর্মসংস্থান ও জীবিকা ভিত্তিক গ্রামীণ কর্মসূচি চালু হওয়ার কথাও জানান মন্ত্রী। এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য পরিবারগুলি বছরে ১২৫ দিন পর্যন্ত মজুরিভিত্তিক কাজের সুযোগ পাবে। কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথভাবে এই কর্মসূচির ব্যয় বহন করবে।
গ্রামীণ আবাসন প্রকল্পের প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, যোগ্য উপভোক্তাদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে সমীক্ষা শুরু হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলবে। সমীক্ষা, যাচাই ও গ্রামসভার অনুমোদনের পর প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির প্রসঙ্গে তিনি জানান, চলতি অর্থবর্ষে ১ লক্ষ নতুন স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণের ব্যবস্থা করা হবে এবং প্রতিটি গোষ্ঠীর জন্য গড়ে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি ২০ লক্ষ ‘লাখপতি দিদি’ তৈরির লক্ষ্যে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
পানীয় জল, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৭ লক্ষ গৃহস্থালি শৌচাগার, ৫ হাজার কমিউনিটি স্যানিটেশন কমপ্লেক্স, ৭০টি বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র এবং ৩৬টি প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। রাজ্যের সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েতে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকাঠামো উন্নত করা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে নিয়োগ প্রসঙ্গে। দিলীপ ঘোষ জানান, রাজ্যের তিন স্তরের পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বর্তমানে ১১ হাজার ১৫৪টি পদ খালি রয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫৩৬টি পদে সরাসরি নিয়োগের অনুমোদন ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে সরকার উদ্যোগী হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, পঞ্চায়েত প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে বিশেষ নিরীক্ষা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় কর্মরত কর্মীদের বদলি, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, গ্রামসভা আয়োজন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল প্রশাসনকে আরও কার্যকর করার কাজও চলছে।
দিলীপ ঘোষের কথায়, ‘গ্রামের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। উন্নয়নের সুফল যাতে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছেও পৌঁছায়, সেই লক্ষ্যেই ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে সরকার।’