পাপিয়া চৌধুরী
বিস্ময়ে, মুগ্ধতায় ভরিয়ে তুললেন অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস প্রেক্ষাগৃহ। ঋদ্ধ করলেন দর্শকদের। তিনি আর কেউ নন, কিংবদন্তি ছন্দা চট্টোপাধ্যায়। বাংলা থিয়েটারের মঞ্চে এই প্রথমবার কোনও অভিনেত্রী তাঁর নিজেরই ভূমিকায়। উষ্ণিক দলের নতুন নাটক ‘ইতি ছন্দা’।
Advertisement
প্রযোজনাটি নাট্যকার-পরিচালক ঈশিতা মুখোপাধ্যায় সাজিয়েছেন অভিনেত্রী ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের ঘটনা নিয়েই। এমন ভাবনায় যে নাটক হতে পারে, তা দেখালেন ঈশিতা। নির্মেদ গতি, মোহিত হয়ে প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে তাঁর জীবনের নানা পরত, আনন্দ, বিষাদ, আক্ষেপ, দৈনন্দিন যাপন, আত্মবিশ্লেষণ, ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা, নাটক ও যাত্রাপালার বেশ কিছু মুহূর্ত— সবই মঞ্চে তুলে ধরেছেন পরিচালক ও অভিনেত্রী। অবলীলায় অভিনয়হীন অভিনয় ও নিখুঁত সুরে নাটক ও যাত্রাপালার গান— তার মধ্যে রবীন্দ্রসংগীত, ঠুমরীও গেয়ে চলেন প্রবীণা, থুড়ি আশি-ছোঁয়া যুবতী ছন্দাদি। এ এক বিরল বিস্ময়।
Advertisement
এমন সাহসী ভাবনা ও প্রযোজনার জন্য সাধুবাদ ও কুর্নিশ জানাই। জীবনকৃতি সন্মান এভাবেও দেওয়া যায়। প্রায় একক অভিনয়, নাটকের বাঁকে ‘শাহজাহান’ নাটকের গান তুলতে মিন্টু (অরুনিতা দে) এসেছেন আর অভিনেত্রীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন অরিজিৎ (অরিন্দম রায়)। তিনিই যেন সূত্রধর, দু’জনেই বেশ সাবলীল। অভিনব প্রযোজনাটি বাংলা নাট্য ইতিহাসের এক দলিল। কণ্ঠটি সজীব, সতেজ, সাবলীল, নৃত্য বিভঙ্গেও মন কাড়েন জনহৃদয়জয়ী ছন্দা চট্টোপাধ্যায়। কী করে পারেন এই বয়সে এসেও উৎপল দত্তের ‘ময়না’ হয়ে উঠতে! ‘টিনের তলোয়ার’-এর সেই বিখ্যাত গানটি গেয়ে ওঠেন ‘ছেড়ে কলকেতা হবো পগার পার’। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ করতালিতে নতজানু হয় শিল্পীর সামনে। একসময় বিজ্ঞাপনে লেখা হতো ‘মর্তের উর্বশী’, তাঁকে নিয়ে লটারি হতো, প্রায় কাড়াকাড়িই চলত, কোন যাত্রাদলে তিনি যোগ দেবেন! মঞ্চ, বেতার, পর্দা, টিভি সমস্ত মাধ্যমেই সমান সাবলীল ছিলেন এবং এখনও আছেন। পাঁচ বছর বয়স থেকে (নাটক, যাত্রা, নৃত্যনাট্য) নাগাড়ে অভিনয় করে চলেছেন, এখন বয়স বিরাশি। প্রায় ৭৮ বছরের অভিনয় জীবন।
ছোটবেলার কথা, মা-বাবার কথা, মামাবাড়ির কথা, গান ও নৃত্য, নাট্য শিক্ষকদের কথা, স্বামী-বন্ধু নিমাই সুরের কথা, ক্রাউড সিন থেকে ‘টিনের তলোয়ার’-এর ‘ময়না’ চরিত্র পাওয়া, আবার ‘কল্লোল’-এর লক্ষ্মী চরিত্র থেকে বাদ হওয়ার আফশোস— সবই এসেছে আত্মকথনে। তবুও মনে হয় এখনও জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয়টা করে উঠতে পারেননি। নিঃসঙ্গ জীবনে রাতের আঁধারে নামে একাকী যাপন। জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রই সম্বল, এই বয়সে স্বপ্ন দেখাও কম কথা নয়! নাটকের মধ্যে বলে ওঠেন, ‘কান্না অপছন্দ করি। নিজের জীবন নিজেকেই নিয়ে বাঁচতে হবে। কেঁদে নয়, এগিয়ে চলে বোঝাতে হবে, বেঁচে আছি।’
পরিচালকের নাট্যবুনোট এমনই যে, ছন্দাদির সত্যিকারের ঘরটাকেই মঞ্চে তুলে ধরা হয়েছে, ঘরের ছাদ ফুঁড়ে জল পড়ে। টেবিলে খই-মুড়ির আয়োজন ডিনারের জন্য। মঞ্চ পরিকল্পক গোপাল পোদ্দার সার্থক। সৌমেন চক্রবর্তীর আলোর প্রক্ষেপণ নিলাভ চট্টোপাধ্যায়ের পোস্টারসৃজন বেশ ভালো লাগে। সব কিছুই একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। নাটকের পরেও কিছু বাড়তি পাওনা ও সারপ্রাইজ ছিল। অবশ্যই সেটা স্ক্রিপ্টের বাইরে। যখন পরিচালক গৌতম ঘোষ বলে ওঠেন, ‘আমার অভিনয় জীবনের প্রথম হিরোইন ছন্দা। সেটা ১৯৬৯ সালের দুর্গাবাড়িতে, নাটক ‘নীচের মহল’এ। আমি কান্ত (চোর) আর ছন্দা বাড়িওয়ালীর বোনের চরিত্রে।’ এছাড়াও বিভাস চক্রবর্তী বলেন, ‘দ্রৌপদী’ পালার কথা, ছন্দার পরিচালক হিসেবে ধন্য হয়েছিলেন। অশোক মুখোপাধ্যায়ও তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। মঞ্চে তখন আনন্দাশ্রু নিয়ে ছন্দা চট্টোপাধ্যায়। এমন অমূল্য স্মৃতির ভাণ্ডার ফিরে দেখতে অবশ্যই ‘ইতি ছন্দা’ আবারও দেখা যায়। সত্যিই এক অমূল্য প্রাপ্তির সন্ধান ‘ইতি ছন্দা’।
Advertisement



