অতনু রায়
কলকাতার বুকে গঙ্গার হাওয়া, গড়ের মাঠের প্রেম, কফিহাউসের আড্ডা আর ট্রামের টুংটাং শব্দের মতোই এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য নাম…সত্যজিৎ রায়। দশক পেরোয়, শতক বদলায়, কলকাতা তার খোলস পাল্টে গ্লোবাল আতর গায়ে মাখে। তবু, ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোড আজও থমকে এক মায়াবী নস্টালজিয়ায়। বিশপ লেফ্রয় রোডের সেই বাড়িটার সামনে দাঁড়ালে এখনও মানুষের পা থমকে যায়। কেউ ছবি তোলেন, কেউ শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন… যেন কোনো তীর্থস্থানের দরজায় এসে পৌঁছেছেন। সবার চোখে একটাই অনুভূতি – শ্রদ্ধা। সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি আজ তীর্থের মতো। কেন? এর উত্তর নিছক সিনেমার ফ্রেমে নয়, লুকিয়ে আছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের গভীরে।
Advertisement
১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পেল। বিভূতিভূষণের কালজয়ী উপন্যাসে তিনি নতুন করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন। দর্শক অবাক হয়ে দেখল… এ তো আমার গ্রাম, আমার শৈশব! পর্দায় নিজেকে দেখার সেই প্রথম আনন্দ বাঙালি আজও ভোলেনি। বাঙালি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে চিনেছে অন্যের চোখে; ঔপনিবেশিক দর্পণে, হিন্দি সিনেমার আড়ালে, পশ্চিমের কৌতূহলী দৃষ্টিতে। সত্যজিৎ বাঙালিকে স্বপ্ন দেখালেন নিজেকে নিয়ে। শেখালেন নিজেদের গল্প বলতে।অপু আর দুর্গার রেলগাড়ি দেখার বিস্ময় আজকের এই ইন্টারনেট যুগেও সমান প্রাসঙ্গিক, কারণ তা বিস্ময়ের কাহিনি। ফেলুদার তীক্ষ্ণতা আজও বাঙালি মননে তেমনই প্রাসঙ্গিক, কারণ যুক্তিবাদ কখনও সেকেলে হয় না। তিনি বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন, বিনোদন মানেই ভাসা-ভাসা কিছু নয়; বিনোদন গভীর শিল্পও হতে পারে।
Advertisement
বাঙালি মানসপটে সত্যজিৎ রায় এক আশ্চর্য স্তম্ভ। তাঁকে শুধু ছবি-করিয়ে বলা তো যায় না। তিনি ছিলেন একটা সম্পূর্ণ সংস্কৃতি। পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সুরকার, আঁকিয়ে এবং সাহিত্যিক। সব মিলিয়ে সত্যজিৎ বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনের প্রায় প্রতিটি শাখায় নিজের স্পর্শ রেখে গেছেন। এমন বহুমাত্রিক শিল্পী বাংলা বড় একটা পায়নি। তর্কাতীত ভাবে রবীন্দ্রনাথের পরে সত্যজিৎই সেই মুখ, যাঁকে সারাবিশ্ব বাংলার প্রতীক হিসেবে চেনে। তিনি বাঙালি যাপনের এক অলিখিত পাঠক্রম। এক ম্যাজিশিয়ান, যিনি সেলুলয়েডের ফিতেয় বাঙালির আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন ও মোহভঙ্গের নিখুঁত ছবি এঁকেছিলেন। তিনি বাঙালির রুচি তৈরি করে দিয়েছিলেন, শিখিয়েছিলেন কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের কাজ করে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। তিনি বাঙালি মননের চিরস্থায়ী দোসর। সত্যজিতের অমলিনতার রহস্যই বোধহয় এটা যে আসলে তিনি বাঙালিকে দেখিয়েছিলেন কীভাবে ধুলো থেকে উঠে আকাশ ছোঁয়া যায়।
সত্যজিৎ বাঙালির কাছে প্রজন্মের সেতু। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের যুগে, যেখানে প্রতিদিন নতুন কন্টেন্ট এসে পুরোনোকে সরিয়ে দেয়, সেখানে সত্যজিৎ আশ্চর্যজনকভাবে প্রাসঙ্গিক। সম্পূর্ণ এক বাঙালি প্রতিভা, অথচ বিশ্বজনীন। তাঁর ছবিতে ছিল শেকড়-আঁকড়ে থাকা বাঙালিয়ানার নির্যাস। আজকের তরুণ প্রজন্ম, যারা মৌহুর্তিক বিনোদনে অভ্যস্ত, তারাও ‘চারুলতা’-র নিঃসঙ্গতায় থমকে যায়। ‘জলসাঘর’-এর ক্ষয়িষ্ণু জমিদারের অহংকারকে চেনা লাগে। ‘হীরক রাজার দেশে’ আজও তাদের কাছে স্বৈরাচারের ব্যঙ্গচিত্র। ‘অশনি সংকেত’-এর দুর্ভিক্ষ আজও মনে করিয়ে দেয় সভ্যতার আবরণ কত পাতলা। ‘আগন্তুক’-এর প্রশ্নগুলো আজ তাদেরও… সভ্যতা কি আসলেই এগিয়েছে? সত্যজিৎ পুরোনো হন না, কারণ তাঁর ছবির প্রশ্নগুলো কখনো পুরোনো হয় না। নিজের ছবির প্রতি ফ্রেমে সত্যজিৎ মানুষের চিরন্তন সুখ-দুঃখ, ক্ষুধা-প্রেম-মৃত্যুর যে দর্শন এঁকেছেন, তা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের দাসত্ব মানেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির মূল্যায়ন আরও গভীর হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। তাই আজকে ভোগবাদ আর টুকরো কনটেন্টের ভিড়ে শিল্প যখন হারাচ্ছে তার গাম্ভীর্য, তখন সত্যজিৎ রায় নিজের কাল পেরিয়ে পরের কালকেও স্পর্শ করেন… হয়ে ওঠেন এক নৈতিক কম্পাস, হয়ে ওঠেন কালজয়ী।
সত্যজিতের এই অমলিন আবেদনের অন্যতম কারণ বোধহয় এও যে, তিনি বাঙালির কাছে নক্ষত্র হয়েও কোনওদিন দূরের ছিলেন না। তাঁকে নক্ষত্র বানিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মানসিকতা বাঙালির নেইও। স্বনামধন্য থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্ত, সকলের চিঠির উত্তর তিনি নিজে দিতেন। এই আপাত-গৃহস্থ, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা মানুষটার মধ্যে বাঙালি তার হারিয়ে যাওয়া আদর্শ ‘বাঙালি ভদ্রলোক’-এর ছবি দেখতে পেত। সেই ছবিটা এখনকার চটকদারির যুগে আরও বেশি করে আরাধ্য হয়ে উঠছে। বাঙালি যতদিন বই পড়বে, যতদিন সিনেমা দেখবে, যতদিন আড্ডায় বসবে, সত্যজিৎ রায় ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবেন।
তীর্থ হয় সেখানে, যেখানে মানুষ মনে করে কোনো মহৎ স্পর্শ ছিল। প্রতি বছর ২ মে, সত্যজিত রায়ের জন্মদিনে যখন মানুষ ভিড় করে, তখন সেখানে কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থাকে না, না কোনো বাধ্যবাধকতা। মানুষ নিজে থেকেই আসেন। তাঁরা শুধু একটা স্থাপত্য দেখতে আসেন না। তাঁরা আসেন একটা স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখতে। এইটুকুই তীর্থের সংজ্ঞা… যেখানে কেউ তাড়া দেয় না, মন এমনিই শান্ত হয়। সত্যজিৎ রায় একটা আলোর উৎস। বাঙালি তাঁর কাছে আসে নিজেকে খুঁজে পেতে। ওঁর চলে যাওয়ার এতবছর পরেও বাড়িটা ঠিক সেই কাজটাই করে। প্রতিটি বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয়, তুমি কোথা থেকে এসেছ, তোমার পরিচয় কতটা সমৃদ্ধ। তাই, বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িটার সামনে আজও যখন কেউ দাঁড়ান, আসলে তিনি খুঁজছেন একটা উত্তর যে এই জীবনে কী করলে মানুষ এভাবে হৃদয়ে থাকেন!
আজ যখন বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রেই হুমকির মুখে, তখন সত্যজিৎ রায় এক বিশাল বটবৃক্ষের মতো আমাদের আশ্রয় দেন। তিনি আমাদের আত্মপরিচয়। যখনই বাঙালি তার রুচি ও মননশীলতা নিয়ে সঙ্কটে পড়ে, তখনই সে ফিরে এসেছে, আসে, আসবে… সত্যজিতের কাছে। বলবে… মহারাজা, তোমারে সেলাম।
Advertisement



