• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 2 November, 2026

লোকটা

মালার মনটা আজ বড্ড খারাপ। এতদিনের একটা লোককে এককথায় না আসতে বলার ইচ্ছে তার ছিলো না। তপনের কী দরকার ছিল ওই লোকটাকে আনার। টাকা থাকলেই বুঝি এইভাবে নয়ছয় করতে হয়। সবাই যদি এমন করে, তাহলে পুরনো কাজের লোকগুলো যাবে কোথায়, খাবে কী, সে সব ভাবতে হবে না!

লোকটা

Photo: Statesman

কাজ সেরে চলে আসার সময় মালা কাকিমা বুলবুলিকে বললো, ‘তুই এবার একটা অন্য কাজ দেখে নে। তোর কাকু রিটায়ার করেছে, আমিও গত পরশু রিটায়ার করলাম। আমাদের পক্ষে আর অতো টাকা দিয়ে তোকে রাখা সম্ভব না। বুঝতেই তো পারছিস, দিনকালের যা অবস্থা।’
বুলবুলি আকাশ থেকে পড়লো। কানাঘুষোও শুনছিল এমন কথা। অনেক বাড়ির মাসিমা কাকিমা জেঠিমারা ক’দিন ধরে তাকে বলছিলো, ‘হাতে কাজ না থাকলে বলিস। আমার একটা কাজের লোক লাগবে।’

বুঝতে পারলো যে, মালা কাকিমাই কথাটা চাউর করেছে। তাকে না রাখার কথা, ছেড়ে দেবার কথা। অথচ কতদিনের সম্পর্ক। বড় ছেলেটা যখন দশ এগারো বছরের তখন সে এই বাড়িতে কাজে লেগেছিলো। তারপর বড় ছেলের পনেরো বছর বয়সে ছোট ছেলেটা হয়। সেটা প্রায় তার হাতেই মানুষ। সে এখন বাইরে কোথায় পড়তে গিয়েছে। রান্না করা, ঘর মোছা, বাসন মাজার কাজ করতো আর একবেলা খেতে পেতো। মাইনে খুব বেশি ছিলো না। সাড়ে তিন হাজার টাকা। সেটা বেড়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে সতেরো হাজারে।

কুড়ি-বাইশ বছরের সম্পর্ক। এককথায় ছিন্ন করে দিতে চাইছে মালা কাকিমা। সে ভাবতে পারছিলো না যে, এইভাবে এককথায় এতদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া যায়। রাগ করেই বললো, ‘কী যা তা বলছো? এরমভাবে ছেড়ে দিলে আমি এখন যাবো কোথায়? তোমরা ছিলে আমার বলভরসা। বিপদে আপদে দেখার মানুষ। আমার মেয়ের বিয়ের সময় তোমরা কত কিছু করেছো। আমি ভুলে যাবো সে কথা। নেমখারামি হবে না?’

—কী করবো বল? রাখতে পারছি না যে। রাখতে পারলে কি রাখতাম না। ভেবে দ্যাখ।
—তুমি একটু মাইনে কমিয়ে দাও।
—মাইনে বাড়ানো বা কমানোর কথা নয়। আসলে তোকে আর লাগবে না।
—তোমার বাড়ির গুষ্টির কাজ কে করবে। তুমি? পারবে করতে?
—তোর কাকু একটা লোককে এনেছে। এখন থেকে সেই সব কাজ করবে। ‘বব’ তার নাম।
—তোমার লোক সব কাজ করবে? পারবে? বাসন মাজা কাপড় কাচা ঘরদোর মোছা সব করতে পারবে?
বিস্ময় ঝরে পড়ে বুলবুলির গলায়।
—কেন, কাপড় কাচার মেশিন তো দেখেছিস। দেখিসনি?
—হ্যাঁ।
—তাহলে?
—তুমি না রাখলে আমরা যে না খেতে পেয়ে মরে যাবো। সবে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। বাজারে কতো ধার দেনা। কাজটা চলে গেলে কী করে শুধবো বলো?
—সে দেখবি ঠিক হয়ে যাবো।
—ওই লোকটাকে রাখো। আমাকেও রাখো।
—বুলবুলি অন্যায় বায়না করিস না।
মালা বুলবুলির সামনে থেকে উঠে যায়।

কিছুক্ষণ গোঁজ হয়ে বসে থাকে। আর একবাড়ির রান্নার দেরি হয়ে যাবে বলে উঠে চলে যায়।
এতদিনের কাজের লোককে ছাড়তে মালার খারাপ লাগছিলো। কবে সেই কতদিন আগে তার বাড়িতে কাজে ঢুকেছিলো সে। নৈহাটি থেকে ফার্স্ট ট্রেন ধরে এসে কাজে লেগে পড়তো। তাদের দু’জনের অফিসের রান্না করা, রাজু-রিজুর দেখভালের দায়িত্ব নিজের লোকের মতোই কাঁধে তুলে নিয়েছিল। কখনও কখনও রিজুর স্কুলবাস না এলে পৌঁছে দিত। এমন ভালোমানুষ লোককে নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতো পাড়া প্রতিবেশী। উঠতে বসতে তাকে শুনতে হয়েছে, ‘কপাল করে একটা কাজের লোক পেয়েছো ভাই। চাকরিটা তাই মন দিয়ে করতে পাচ্ছো।’
এ পাড়ার হিংসুটে লোকগুলো বুলবুলিকে ভাঙিয়ে নেবার চেষ্টা যে করেনি, তা তো নয়। কতবার বুলবুলি নিজেই বলেছে, ‘ওই বাড়ির মাসিমা জিজ্ঞাসা করছিল— কত মাইনে দেয় রে তোকে যে গাধার মতো খাটিস।’

বুলবুলি সে সব কথায় পাত্তা না দিয়ে তার কাছেই থেকে গিয়েছে এতদিন নিজের মতো করে।
মালার মনটা আজ বড্ড খারাপ। এতদিনের একটা লোককে এককথায় না আসতে বলার ইচ্ছে তার ছিলো না। তপনের কী দরকার ছিল ওই লোকটাকে আনার। টাকা থাকলেই বুঝি এইভাবে নয়ছয় করতে হয়। সবাই যদি এমন করে, তাহলে পুরনো কাজের লোকগুলো যাবে কোথায়, খাবে কী, সে সব ভাবতে হবে না!

—রাত তো অনেক হলো। খাওয়া দাওয়া হবে না নাকি? বলতে বলতে তপন ঘরের অন্ধকার দূর করে আলো জ্বালে।
—হ্যাঁ, যাই চলো। মালা উঠে যায় মুখ লুকিয়ে। খেতে বসে কেউ কারোর দিকে তাকায় না। মাথা নিচু করে খেয়ে উঠে যায়। হাতের কাজ সেরে বিছানায় উঠতে উঠতে বললো, ‘লোকটাকে ফেরত দিয়ে দাও।’
—এখন আর তা হয় না। তোমার সঙ্গে পরামর্শ করেই কাজটা করা হয়েছে ভুলে যেও না সে কথা।
—হ্যাঁ ঠিক আছে। তবুও…
—কোনও ‘কিন্তু’ ‘অথচ’ ‘তবুও’ চলবে না। এটা আমার শেষ কথা। দু-পাঁচ হাজার টাকা দরকার থাকলে দিয়ে দাও। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই সিদ্ধান্ত পাল্টাবে না।

দু’দিন বুলবুলি কাজে এলো না। মাইনের টাকা নিতে এলো না। তৃতীয় দিন চোখ মুখ ফুলিয়ে এলো। রিকশা চালানো বর মদ খেয়ে এসে বুলবুলির কাজ চলে গিয়েছে শুনে মারধর করেছে। বুলবুলির মার খাওয়া তার বুকে বাজলো। কাজের লোক বলে নয়। বাজলো তার জন্য মার খেতে হয়েছে বলে।

তখন বব বাসন মাজছিল। বাসন ধোওয়ার পর দেখা গেলো জায়গায় জায়গায় এঁটো দাগ লেগে রয়েছে। বুলবুলি সেগুলো নিয়ে আবার ধুতে বসে। লোকটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। একসময় মাসের মাইনে নিয়ে চলে যাবার সময় বুলবুলি বলে, ‘কাকিমা দরকার পড়লে ডেকো।’ চোখের জল লুকোতে পারল না সে।

—কাঁদিস না, বুলবুলি। তোর যখন যা দরকার হবে চেয়ে নিস আমার কাছ থেকে। তোকে আমি কোনোদিন কাজের লোক ভাবিনি। আমার বোনের মতই ভেবেছি। তুই আমাদের জন্য যা করেছিস সে কথা ভোলা যায় বল!
বুলবুলি চলে যায় স্টেশনের দিকে নৈহাটির ট্রেন ধরতে।

আর একদিন বিকেলের দিকে এসে বুলবুলি বললো, ‘জানো কাকিমা বোসবাড়ির মাসিমা বলছিলো ওদের বাড়িতে কাজ করার কথা। আমি না বলে দিয়েছি। যেই না বলেছি অমনি কী বললো জানো?’
—কী?
—বললো, বেইমান বেইমান। এতবছর জল-ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে কাজ করলি। তার কিনা এই প্রতিদান! ধুপ করে ছাড়িয়ে দিল। আমরা হলে বাবা পারতাম না। দীঘ্ঘদিন বাড়িতে থাকলে কুকুর বিড়ালের উপরও মায়া পড়ে। আর এতো মানুষ। কী নিষ্ঠুর প্রাণ রে বাবা। কী বলে ছাড়ালো?
—সে তোমাদের বলবো কেন! যাই বলো আর তাই বলো, তোমাদের কাজ করবো না।
—কেন, কাজ করবি না কেন? তোরও তো টাকা পয়সার দরকার, বুলবুলি।
—অন্য জায়গায় করবো। এ পাড়ায় করবো না। তুমি তো লোক চেনো না। এ পাড়ার একটা লোকও ভালো না।
—কী যে বলিস তুই?
—ঠিকই বলছি। এখন দরদ দেখিয়ে রাখবে, তারপর পান থেকে চুন খসলে দূর দূর করে তাড়াবে।
—তাড়াবে কেন? ওদেরও তো কাজের লোক লাগবে বলেই তোকে ডাকছে।
—ওদের তুমি চেনো না কাকিমা। ওরা এক একটা খাণ্ডারনি। সারাদিন তো থাকতে না! জানো না ওদের ব্যবহার। একটা কাজের লোকও ওদের বাড়িতে থাকতে চায় না। দু’চার মাস কাজে রাখার পর মাইনে দেবার ঠিক আগে আগে চুরির বদনাম দিয়ে কাজ থেকে ছাড়াত। আমার কথা বিশ্বাস না হয় সতের মাকে ডেকে আনছি।
—না, থাক। তোকে আর কাউকে ডাকতে হবে না।

ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল বব। ভাবছিল সে আসায় মেয়েটার কাজ চলে গিয়েছে। উপায় খুঁজছিল কীভাবে মেয়েটার কাজ ফিরিয়ে দেওয়া যায়।
বুলবুলি জিজ্ঞাসা করলো, ‘তোমাদের লোকটা কেমন করছে কাজ?’
বাড়ির মালকিন কী বলে শোনার জন্য সে কান খাড়া করলো।

—ওই একরকম। একটু আধটু ভুলভাল করছে। কানে কম শোনে বোধ হয়।
—ঘরদোর ঝাঁটপাট তো ভালোই দেয়। ঝকঝক তকতক করছে। বলতে বলতে একগোছা চুল তুলে আনলো, একটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের ছিপিও বুলবুলির নজর এড়ালো না। লোকটা সব দেখলো, শুনলো। কিছু বললো না। এই লোকটা কিছু বলে না। আলাদিনের দৈত্যের মতো হুকুম তামিল করে শুধু। খুব বেশি কাজ থাকে না তার। যা যা করার তা ঘণ্টা দু-একের মধ্যে হয়ে যায়। সারাদিন শুধু শুয়ে বসে থাকা। এর আগে যেখানে ভাড়ায় খাটতে গিয়েছিল, সেখানে ছিলো শুধু কাজ কাজ আর কাজ। বসা শোয়ার কোনও ফুরসৎ ছিল না। সেই তুলনায় এই বেশ ভালো। কিন্তু একটা খচখচানি আছে তার। বুলবুলি। এ বাড়ির অনেক দিনের কাজের লোক। সে আসায় তার কাজ গিয়েছে।
পরের দিন সকালে হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড।
বব কোনও কথা শুনছে না। ঘরের কোনায় নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে। নড়ছে চড়ছে না। সমস্ত যন্ত্রপাতি যন্ত্রের কলকব্জা সারা ঘরময় ছড়ানো ছিটানো। তখন সবে মাত্র বুলবুলি দরজায় কড়া নাড়ছে।