একটি রেখা কখনও কখনও একটি গোটা জীবনের চেয়েও দীর্ঘ হতে পারে। তার মধ্যে জড়িয়ে থাকতে পারে দেশ হারানোর বেদনা, শৈশবের স্মৃতি, মানুষের নিঃসঙ্গতা, শরীরের গোপন ভাষা এবং সময়ের অস্থিরতা। রেখা দিয়ে এমন এক জগৎ নির্মাণ করেছিলেন যোগেন চৌধুরী, যেখানে মানুষের শরীর কেবল শরীর নয়, তার ভিতরে জমে থাকা ক্ষত, অভিজ্ঞতা, অন্ধকার, আকাঙ্ক্ষা ও যন্ত্রণারও এক দৃশ্যমান মানচিত্র। তাঁর আঁকা মানুষেরা যেন আমাদেরই পরিচিত কেউ— অথচ তাদের মুখের ভিতরে, শরীরের বাঁকে, চোখের গভীরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যার নাগাল আমরা সহজে পাই না।
তাঁর ছবিতে মানুষের মুখ ও শরীর যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়ে অনেক বেশি উপস্থিত থাকে অদৃশ্য এক অন্তর্জগৎ।
ওইসব মানুষের দিকে তাকালে মনে হয়, শরীরের ভিতরে কোনও অস্থির নদী বয়ে চলেছে। কোথাও মাংস ফুলে উঠেছে, কোথাও চামড়া কুঁচকে গিয়েছে, কোথাও হাত-পা অদ্ভুতভাবে বেঁকে আছে। চোখ দুটি বড়, কখনও বিস্মিত, কখনও বিষণ্ণ, কখনও যেন আমাদেরই বিচার করছে। এই মানুষদের নিখুঁত বলা যায় না, সুন্দর বললেও সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে তাদের মেলে না। অথচ তাদের কাছ থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া কঠিন। কারণ, তাদের বিকৃতির মধ্যেই আমরা দেখতে পাই জীবনের এমন এক সত্য, যা নিখুঁত অবয়বের আড়ালে প্রায়ই ঢাকা পড়ে থাকে।
২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর কলকাতায় ৮৭ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন যোগেন চৌধুরী। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও রক্তের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের অবসান ঘটল তাঁর জীবনে। কিন্তু তাঁর ছবির মানুষগুলি রয়ে গেল। তাদের শরীরে জমে থাকা সময়, চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্ন এবং রেখার মধ্যে স্পন্দিত জীবনের অসংখ্য অর্থ নিয়ে তারা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলায় তাঁর অবদানকে বুঝতে গেলে তাই শুধু একজন বিখ্যাত চিত্রকরের জীবনপঞ্জি জানলে চলে না। বুঝতে হয়, কেন তিনি বারবার মানুষের কাছে ফিরেছেন, কেন শরীরকে করেছেন অনুভূতির প্রধান আশ্রয়, আর কীভাবে একটি রেখাকে পরিণত করেছেন মানুষের অস্তিত্বের ভাষায়।
১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। তাঁর শৈশবের চারপাশে ছিল বাংলার গ্রামজীবন, লোকাচার, উৎসব, প্রতিমা নির্মাণ এবং মানুষের হাতের কাজ। শিল্প তাঁর কাছে প্রথম থেকেই কোনও দূরের, বিশেষজ্ঞদের জন্য সংরক্ষিত বিষয় ছিল না। বাড়ির মধ্যে, উঠোনে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে, দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে তার উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক।
তাঁর বাবা ছবি আঁকতেন, মা আলপনা দিতেন। গ্রামের প্রতিমাশিল্পীদের কাজও ছোটবেলা থেকেই তাঁকে আকৃষ্ট করত। মাটির ভিতর থেকে দেবদেবীর অবয়ব বেরিয়ে আসা, মুখের গড়ন তৈরি হওয়া, চোখ আঁকার পর প্রতিমার মধ্যে যেন প্রাণের সঞ্চার— এই রূপান্তরের প্রক্রিয়া তাঁর শিশুমনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। প্রতিমার চোখের সেই বিস্ময়কর উপস্থিতি পরবর্তী জীবনে তাঁর আঁকা মানুষের চোখের মধ্যেও যেন ফিরে এসেছে।
লোকশিল্পের এই উত্তরাধিকার তাঁর কাছে কেবল নান্দনিক শিক্ষা ছিল না। তা ছিল মানুষ ও তার পরিবেশকে দেখার একটি পদ্ধতি। বাংলার আলপনায় যেমন অল্প কয়েকটি রেখা ও চিহ্ন দিয়ে তৈরি হয় এক সম্পূর্ণ নকশার জগৎ, তেমনই যোগেনের ছবিতেও সামান্য রেখা ক্রমে জটিল হয়ে ওঠে, অথচ মূল প্রবাহ হারায় না। বাংলার কাঁথার সেলাই, আলপনার বাঁক, কালীঘাট পটের দ্রুত ও সাবলীল রেখা— এসব ঐতিহ্য তাঁর শিল্পের গভীরে প্রবেশ করেছিল। তিনি এগুলিকে অনুকরণ করেননি, নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের নতুন অর্থ দিয়েছিলেন।
কিন্তু শেকড়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সব সময় সহজ থাকে না। কখনও ইতিহাস সেই শেকড় উপড়ে দেয়। দেশভাগের ফলে যোগেনের পরিবারকে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে হয়। পরিচিত ভূগোল বদলে গেল, বদলে গেল জীবনযাপনের নিরাপত্তা। ছিন্নমূল মানুষের জীবনে শুধু বাড়ি হারানোর ঘটনাই ঘটে না, হারিয়ে যায় পরিচিত পরিবেশের নিশ্চিন্ততা, স্মৃতির আশ্রয় এবং নিজের পৃথিবীর উপর স্বাভাবিক অধিকারবোধ।

এই অভিজ্ঞতা যোগেনের শিল্পের ভিতরে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। দেশভাগের ইতিহাস তিনি সব সময় সরাসরি আঁকেননি, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা তাঁর ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর মানুষেরা অনেক সময় একে অন্যের পাশে থেকেও দূরে থাকে। দুটি শরীরের মধ্যে থাকে অদৃশ্য ব্যবধান। একক অবয়বও যেন নিজের শরীরের ভিতরে সম্পূর্ণ আশ্রয় পায় না। এই নিঃসঙ্গতা কেবল ব্যক্তিগত বিষণ্ণতা নয়, এর ভিতরে
রয়েছে ইতিহাসের অভিঘাত, স্থানচ্যুতির স্মৃতি এবং অনিশ্চিত পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা।
অভাবের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও ছিল গভীর। শিল্পশিক্ষার দিনগুলিতে কেরোসিনের লণ্ঠনের আলোয় বসে আঁকতেন তিনি। সেই আলো ভাগ করে নিত তাঁর ছোট ভাইবোনেরা। দামি উপকরণ কেনার সামর্থ্য ছিল না, কাগজ ও সাধারণ কালিই ছিল সহজলভ্য অবলম্বন। জীবনের এই বাস্তবতা তাঁকে সীমিত উপকরণের মধ্যে অসীম সম্ভাবনা খুঁজতে শিখিয়েছিল। পরবর্তীকালে তাঁর কালির রেখা যে এমন শক্তিশালী শিল্পভাষা হয়ে উঠবে, তার পেছনে ছিল প্রতিভার পাশাপাশি এই জীবনের অভিজ্ঞতাও।
কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে পড়াশোনা শেষ করে যোগেন চৌধুরী উচ্চশিক্ষার জন্য যান প্যারিসে। ১৯৬৫ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে তিনি একোল নাশিওনাল সুপিরিয়র দে বোজ-আর্তস-এ যোগ দেন। ইউরোপীয় শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় তাঁর সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। আধুনিক শিল্পের নানা আন্দোলন, গড়ন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রং ও রেখার স্বাধীন ব্যবহার— সবই তাঁকে ভাবিয়েছিল।
কিন্তু অন্যের সাফল্য দেখার মধ্যেই নিজের পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং কখনও কখনও সেই সাফল্যই নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। প্যারিসে গিয়ে যোগেন বুঝতে পেরেছিলেন, ইউরোপীয় শিল্পীরা তাঁদের সময় ও সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের ভাষা তৈরি করেছেন। তাঁদের অনুকরণ করে নিজের শিল্পীসত্তাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাঁকে ফিরতে হবে নিজের দেখা মানুষের কাছে, নিজের সমাজের কাছে, নিজের স্মৃতির কাছে।
দেশে ফিরে মাদ্রাজের ওয়েভার্স সার্ভিস সেন্টারে কাজ করার সময় তিনি আঁকার পাশাপাশি নিজের শিল্পভাষা নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা চালিয়ে যান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নিয়ম তাঁকে দক্ষতা দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর ছবির স্বাতন্ত্র্য গড়ে উঠেছিল সেই নিয়মের বাইরে যাওয়ার সাহসে। তিনি মানুষের শরীরকে বাস্তবের নিখুঁত প্রতিরূপ হিসেবে দেখানোর বদলে তার ভিতরের অনুভূতিকে দৃশ্যমান করতে চাইলেন। শরীরের অনুপাত বদলে গেল, অবয়বের রেখা বাঁক নিল, মাংসল অংশগুলি কখনও অস্বাভাবিকভাবে স্ফীত হল। এই বিকৃতি কোনও খেয়ালখুশির ফল ছিল না। এর মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের ভিতরের জটিলতাকে প্রকাশ করছিলেন।
এইখানেই যোগেন চৌধুরীর শিল্পের মৌলিকত্ব। তিনি পাশ্চাত্যের আধুনিকতার সঙ্গে বাংলার লোকঐতিহ্যের এমন একটি সংলাপ তৈরি করেছিলেন, যেখানে কোনও পক্ষই অন্য পক্ষের অনুগত হয়ে থাকেনি। ইউরোপ তাঁকে দিয়েছিল শিল্পের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস, বাংলা তাঁকে দিয়েছিল মানুষ, স্মৃতি, লোকজ অভিজ্ঞতা এবং রেখার নিজস্ব ছন্দ। দুইয়ের মিলনে জন্ম নিল এক স্বতন্ত্র জগৎ। বিশ্বের চিত্রকলার যাবতীয় অভিজ্ঞতা ও ভাবনা আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন বলেই এ কাজ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল।
যোগেন চৌধুরীকে চিনতে গেলে তাঁর রেখাকে চিনতে হয়। কারণ, তাঁর ছবিতে রেখা নিছক অবয়ব আঁকার উপায় নয়। তা একাধারে গঠন, আবেগ, ছন্দ এবং চরিত্রের প্রকাশ। তাঁর রেখা চলতে চলতে কখনও ঘুরে যায়, কখনও নিজেকে অতিক্রম করে, কখনও অসংখ্য ছোট ছোট আঁচড়ে ঘন হয়ে ওঠে। অথচ এই জটিলতার মধ্যেও রেখার প্রবাহ অক্ষুণ্ণ থাকে। তার চলার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের স্বাভাবিকতা, যেন হাতটি কাগজের উপর কোনও পরিকল্পিত পথ অনুসরণ করছে না, বরং শরীরের ভিতরে জমে থাকা অনুভূতির নির্দেশ মেনে চলেছে।
তাঁর ছবির মানুষদের শরীর তাই একটিমাত্র বাহ্যিক সীমারেখা দিয়ে তৈরি হয় না। অসংখ্য ছোট রেখা, পরস্পরকে ছেদ করা আঁচড় এবং ঘন ক্রস-হ্যাচিংয়ের মাধ্যমে শরীরের গঠন তৈরি হয়। কোথাও সেই রেখা পেশির টান বোঝায়, কোথাও চামড়ার ভাঁজ, কোথাও মাংসের ভার, আবার কোথাও মানসিক অস্বস্তির আভাস দেয়।
শিল্প-ইতিহাসবিদ আর শিবকুমার যোগেনের এই শরীর নির্মাণের পদ্ধতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেখার বুননের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। যেন ছোট ছোট সেলাইয়ের মতো রেখা জুড়ে শরীরের অবয়ব তৈরি হচ্ছে। এই তুলনা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, যোগেনের রেখা কখনও শরীরের উপরিভাগে থেমে থাকে না, তা যেন শরীরের ভেতর থেকে উঠে আসে। ফলে তাঁর ছবির মাংসলতা শুধু দৃশ্যমান নয়, অনুভবযোগ্যও হয়ে ওঠে।

এই রেখার জাদুতে শরীরের বিকৃতিও নতুন অর্থ পায়। সাধারণ চোখে যে গড়ন অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, শিল্পীর হাতে তা হয়ে ওঠে মানুষের মানসিক অবস্থার প্রতীক। শরীরের ভার যেন জীবনের ভার, ঝুলে পড়া অঙ্গ যেন ক্লান্তির চিহ্ন, অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে
ওঠা উদর যেন ভোগের আকাঙ্ক্ষা কিংবা আত্মতৃপ্তির ব্যঙ্গচিত্র। আবার একই শরীরে থাকতে পারে অসহায়তা ও কোমলতা।
তাঁর ছবিতে রং এই রেখার পরিপূরক। জলরং, প্যাস্টেল, তেলরং কিংবা কালির কাজে মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু রেখার প্রতি তাঁর আস্থা বদলায়নি। রং শরীরকে আয়তন দেয়, তার উপস্থিতিকে আরও ঘন করে তোলে। অন্ধকার পটভূমিতে শরীর কখনও আরও নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে, কখনও তার উপস্থিতি তীব্রতর হয়। রং ও রেখার এই সম্পর্ক তাঁর ছবিতে এমন এক আবহ তৈরি করে, যেখানে বাস্তব ও স্বপ্নের সীমা ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায়।
যোগেনের ছবির চোখগুলি নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হয়। বড়, খোলা, স্থির চোখ তাঁর মানুষের মুখে এক অদ্ভুত উপস্থিতি তৈরি করে। তারা যেন একই সঙ্গে বিস্মিত এবং চিন্তামগ্ন। কখনও মনে হয়, তারা পৃথিবীকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কখনও মনে হয়, পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থেকেও তারা অন্য কোনও জগতে নিমগ্ন।
এই চোখের মধ্যে শিল্পীর শৈশবের স্মৃতি থাকতে পারে, থাকতে পারে মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধান। কিন্তু তাদের কোনও একটি অর্থে বেঁধে দেওয়া যায় না। একটি চোখ একই সঙ্গে কৌতূহল, ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও একাকিত্ব প্রকাশ করতে পারে। দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ছবির কাছে যান এবং ছবিও তাঁকে নিজের ভিতরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।
যোগেন চৌধুরীর মানুষেরা এই কারণে নিছক প্রতিকৃতি নয়। তাদের মুখ কাল্পনিক হতে পারে, কিন্তু তাদের মানসিক উপস্থিতি বাস্তব। আমরা হয়তো কোনও নির্দিষ্ট মানুষকে চিনতে পারি না, অথচ তার মধ্যে নিজের পরিচিত কারও ছায়া খুঁজে পাই। কখনও মনে হয়, এই মানুষটিকে কোথাও দেখেছি। পরক্ষণেই বুঝতে পারি, তার ভিতরের অস্বস্তি বা নিঃসঙ্গতা আমাদের নিজেদেরও অচেনা নয়।
এই পরিচিতি ও অপরিচিতির মাঝখানেই তাঁর শিল্পের গভীরতা। তিনি দর্শককে কোনও সহজ গল্প শোনান না। ছবির মানুষটি কেন দুঃখী, কেন তার শরীর এমন, কেন তার চোখে এমন দৃষ্টি— এসব প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর সব সময় মেলে না। ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তার রেখা ও নীরবতার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তৈরি করতে হয়।
তাঁর শিল্পের এই বৈশিষ্ট্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষকে বোঝার জন্য কেবল তার দৃশ্যমান পরিচয় যথেষ্ট নয়। তার ভিতরে এমন অনেক স্তর থাকে, যেগুলি কোনও একটি ব্যাখ্যায় ধরা পড়ে না। যোগেনের ছবি সেই অজানাকে মুছে দেয় না, বরং তাকে শিল্পের মর্যাদা দেয়।
মানুষের শরীর নিয়ে তাঁর নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি যোগেন চৌধুরী ছিলেন তীক্ষ্ণ সমাজদ্রষ্টা। তাঁর ছবিতে ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে মিশেছে সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা। ক্ষমতা, ভোগ, সামাজিক মর্যাদা, মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বন্দ্ব এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাঁর শিল্পের নানা স্তরে প্রকাশিত হয়েছে।
সত্তরের দশকে তাঁর কাজে ব্যঙ্গ ও রূপকের ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। এই সময়ের ভারতীয় সমাজ ছিল নানা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক বৈষম্যের বাস্তবতা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। যোগেন সেই বাস্তবতাকে সরাসরি বিবরণ হিসেবে আঁকার বদলে মানুষের অবয়বের ভিতরে তার চিহ্ন খুঁজেছেন।
১৯৭৪ সালের ‘দ্য ইয়ুথ’ ছবিতে এক টাকমাথা মধ্যবয়স্ক পুরুষের হাতে ধরা বহুরঙা বলকে রাজনৈতিক ক্ষমতার রূপক হিসেবে পড়া যায়। বলটি যেন এমন এক খেলায় ব্যবহৃত হচ্ছে, যার নিয়ম নির্ধারণ করে অন্য কেউ। সাধারণ একটি বস্তু কীভাবে ক্ষমতার জটিল সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, ছবিটি তার উদাহরণ।
কালীঘাট পটের ব্যঙ্গধর্মী ঐতিহ্য থেকে প্রেরণা নিয়ে তিনি আধুনিক সমাজের বাবু-সংস্কৃতি, ভোগবিলাস ও আত্মম্ভরিতাকে নতুনভাবে দেখিয়েছেন। তাঁর আঁকা অভিজাত পুরুষ কিংবা অলংকৃত নারী কখনও কৌতুকের, কখনও অস্বস্তির জন্ম দেয়। বাহ্যিক সাজসজ্জার আড়ালে মানুষের দুর্বলতা, লোভ কিংবা আত্মপ্রবঞ্চনা যেন শরীরের মধ্যেই ধরা পড়ে।
তবে তাঁর ব্যঙ্গ কখনও কেবল নিন্দা নয়। মানুষকে বিদ্রূপ করার মধ্যেও তিনি তার অসহায়তা ও ভঙ্গুরতাকে প্রকাশ করেছেন। ক্ষমতাবান মানুষও নিজের শরীর ও মনের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত নয়। ভোগের আকাঙ্ক্ষায় নিমগ্ন মানুষও নিঃসঙ্গ হতে পারে। সামাজিক মর্যাদার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর শূন্যতা। এই দ্বৈত দৃষ্টিই তাঁর শিল্পকে একমাত্রিক রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিণত হতে দেয়নি।
২০০৫ সালে ইরাকে বন্দিদের উপর মার্কিন সেনাদের নির্যাতনের প্রসঙ্গ নিয়ে তৈরি তাঁর ছবির ধারায় এই সামাজিক বিবেক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে মানুষের শরীর শুধু ব্যক্তিগত যন্ত্রণার বাহন নয়, তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য। শরীরের উপর অত্যাচার মানে মানুষের মর্যাদাকে আঘাত করা। তাঁর রেখা সেই আঘাতকে দৃশ্যমান করে।
অতিমারির সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশাও তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। জীবিকার সন্ধানে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া মানুষের অনিশ্চিত যাত্রা, সংকটের সময় তাদের অসহায়তা এবং সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পীসত্তাকে নতুন করে আলোড়িত করে। নিজের দেশভাগের স্মৃতির সঙ্গে এই মানুষের অভিজ্ঞতার কোনও সরল সমীকরণ করা যায় না, কিন্তু উভয়ের মধ্যে রয়েছে ঘর, নিরাপত্তা ও আশ্রয় হারানোর গভীর বেদনা। এখানেই যোগেনের শিল্প ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছাড়িয়ে বৃহত্তর মানবিক চেতনার অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনে কিপার অব আর্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন যোগেন চৌধুরী। ২০১৪ সালে তিনি রাজ্যসভার সদস্য হন এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই দুই অভিজ্ঞতা তাঁকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির পরিসরের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করেছিল। কিন্তু তাঁর কাছে রাজনীতি কেবল দল, পদ বা বক্তব্যের বিষয় ছিল না। তিনি খুঁজতেন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা মানুষটিকে।
সংসদের অধিবেশনে নানা ব্যক্তিত্বের মুখ, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তিনি স্কেচ করতেন। তাঁর আগ্রহ ছিল, একজন রাজনীতিকের বাহ্যিক পরিচয়ের ভিতরে কী ধরনের মানুষ বাস করেন। তাঁর এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল এই উপলব্ধি— রাজনীতিকের পিছনে থাকা মানুষটিকে তিনি এখনও আবিষ্কার করতে পারেননি।
এই অনুসন্ধান তাঁর শিল্পেরই সম্প্রসারণ। কারণ, তাঁর ছবির মানুষেরাও কোনও একটি পরিচয়ে সম্পূর্ণ ধরা পড়েন না। শরীর দৃশ্যমান, কিন্তু মন আংশিক গোপন। মুখ সামনে আছে, কিন্তু তার পিছনে রয়েছে অজস্র অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতা। মানুষকে বুঝতে গেলে তাকে দেখতে হয় বারবার, নানা দিক থেকে। যোগেনের শিল্প আমাদের সেই ধৈর্য শেখায়।
একজন শিল্পী নিজের ছবির মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দেখতে পারেন। কিন্তু শিল্পের জগৎকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গেলে দরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করা। যোগেন চৌধুরী এই প্রয়োজন গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন।
১৯৭৫ সালে দিল্লিতে ‘গ্যালারি ২৪’ ও ‘আর্টিস্টস ফোরাম’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে তিনি যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল শুধু ছবি আঁকার কৌশল শেখানো নয়, শিল্পী হিসেবে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার সাহস জোগানোও।
তরুণদের কাজ কেনা, তাদের উৎসাহ দেওয়া এবং শিল্পচর্চার জন্য সম্মিলিত পরিসর তৈরি করার মধ্যে তিনি ভবিষ্যতের শিল্পজগতকে শক্তিশালী করার পথ দেখেছিলেন। শান্তিনিকেতনে শিল্পীদের মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে তাঁর এই ভাবনার সম্পর্ক ছিল। কলকাতাতেও শিল্পশিক্ষা ও শিল্পচর্চার প্রসার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন।
২০১৯ সালে কলকাতায় তাঁর শিল্পকর্ম সংরক্ষণ ও শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে ‘চারুবাসনা’। তাঁর কাছে শিল্পকেন্দ্র মানে শুধু ছবি রাখার ঘর নয়, তা হওয়া উচিত মানুষের মিলনস্থল, যেখানে শিল্পী, দর্শক ও শিক্ষার্থীরা একে অন্যের কাছ থেকে শিখতে পারবেন।
রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন-ভাবনার সঙ্গে এই উদ্যোগের এক ধরনের আত্মীয়তা রয়েছে। শিল্পকে জীবনের বাইরে আলাদা করে রাখা নয়, বরং শিক্ষা, সমাজ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে তার চলাচল নিশ্চিত করা— এই ছিল তাঁর বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা। তিনি জানতেন, একজন শিল্পীর কাজ তাঁর নিজের জীবনেই শেষ হয় না। পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সেই কাজের নতুন অর্থ জন্ম নেয়।
যোগেন চৌধুরীর ছবির সামনে দাঁড়ালে শেষ পর্যন্ত আমরা ফিরে আসি মানুষের কাছেই। তাঁর শিল্পে কোনও নিখুঁত মানুষ নেই, নেই এমন কোনও নিশ্চিন্ত পৃথিবী যেখানে সব দ্বন্দ্বের সমাধান হয়ে গেছে। আছে অসম্পূর্ণ শরীর, দ্বিধাগ্রস্ত মুখ, অদ্ভুত ভঙ্গি এবং চোখের
ভিতরে জমে থাকা প্রশ্ন। এই মানুষগুলি কখনও আমাদের হাসায়, কখনও অস্বস্তিতে ফেলে, কখনও নিঃশব্দে বিষণ্ণ করে তোলে।
কিন্তু তাদের দিকে তাকিয়ে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের দুর্বলতা তার অস্তিত্বের বাইরে কোনও ত্রুটি নয়। দুর্বলতা, ভয়, কামনা, অপমান ও নিঃসঙ্গতা নিয়েই মানুষ। এই সত্যকে তিনি সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণার আড়ালে লুকিয়ে রাখেননি। বরং শরীরের বিকৃতি ও রেখার অস্থিরতার মধ্যে তাকে প্রকাশ করেছেন।
তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে। কিন্তু তাঁর ছবির মানুষগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও নতুন অর্থ পাবে। কারণ, তিনি যে নিঃসঙ্গতা এঁকেছেন, তা কোনও একটি যুগের নয়; যে ক্ষমতার দম্ভকে বিদ্রূপ করেছেন, তা কোনও একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়; যে মানবিক ভঙ্গুরতাকে দৃশ্যমান করেছেন, তা আমাদের সকলের জীবনের অংশ।
একটি রেখা কাগজের উপর শুরু হয়, তারপর বাঁক নেয়, অন্য রেখার সঙ্গে মেশে, কোথাও থামে, কোথাও আবার নতুন দিকে এগিয়ে যায়। যোগেন চৌধুরীর শিল্পও যেন তেমনই। তার কোনও একটিমাত্র অর্থ নেই, কোনও চূড়ান্ত ব্যাখ্যায় তার যাত্রা শেষ হয় না। প্রতিবার নতুন করে তাকালে রেখার ভিতরে অন্য কোনও মুখ, অন্য কোনও স্মৃতি, অন্য কোনও বেদনা আবিষ্কৃত হয়।
তাঁর উত্তরাধিকার তাই কেবল কয়েকটি বিখ্যাত ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তা রয়েছে দেখার এক বিশেষ ভঙ্গিতে— যে ভঙ্গি মানুষকে তার বাহ্যিক পরিচয়ে আটকে রাখে না, শরীরের ভিতরে জমে থাকা ইতিহাসের দিকে তাকাতে শেখায়। তাঁর শিল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সত্য সব সময় সুন্দর নয়, কিন্তু সেই সত্যকে দেখার সাহসই শিল্পের অন্যতম বড় শক্তি।




