বারুইপুরের নাবালিকা অপহরণ, গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় আনন্দ সর্দারকে মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। সোমবার দুপুরে এসটিএফ ও এসওজি-র যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এই গ্রেপ্তার ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। রবিবারই আনন্দকে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হলেও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
স্থানায় বাসিন্দা, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ প্রথম থেকেই পুলিশ যথাযথ পদক্ষে করেনি। তাদের প্রশ্ন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাথমিক পর্যায়েই ব্যবস্থা নেওয়া হল না কেন? কেন মুখ্যমন্ত্রীর কড়ার বার্তার পরেই তদন্তের গত এল? নির্যাতিতার পরিবারও অভিযোগ করেছে, নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম দিকে পুলিশ প্রয়োজনীয় তৎপরতা দেখায়নি।
পরিবারের দাবি, বান্ধবীর জন্মদিন উপলক্ষে উপহার কিনতে শনিবার বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ষষ্ঠ শ্রেণির ওই ছাত্রী। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা এবং স্থানীয় যুবকেরা খোঁজ শুরু করেন। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করা হয়। তারপর তাদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কাজও মূলত স্থানীয়রাই করেন বলে দাবি। শনিবার রাত ৯টা নাগাদ থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হলেও, প্রথম দিকে পুলিশের সক্রিয়তা ছিল না বলেই অভিযোগ উঠেছে।
নির্যাতিতার কাকা জানান, প্রথম দিকে তদন্তে পুলিশের গাফিলতি ছিল। যদিও পরে থানার আইসি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মুখ্যমন্ত্রী-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর আরও দাবি, রবিবার দুজন সন্দেহভাজনকে স্থানীয়রা ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও তাঁদের মধ্যে একজনকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। কেন এমন সিদ্ধান্ত, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে, ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে হস্তক্ষেফ করেছে জাতীয় মহিলা কমিশন। কমিশন সাত দিনের মধ্যে রাজ্যের ডিজিপির কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি, প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনাও রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মামলায় প্রথমে প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দার নামে দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার তাঁদের বারুইপুর আদালতে তোলা হলে সরকার পক্ষ জানায়, নমুনা সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং তথ্যপ্রমাণ সুরক্ষিত রাখার স্বার্থে পুলিশি হেফাজত নেওয়া প্রয়োজন। আদালতে সেই আবেদন মঞ্জুর করে দুই অভিযুক্তকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে মঙ্গলবার আদালতে তোলা হবে।
মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধর্ষণ, গণধর্ষণ, খুন, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। পাশাপাশি পকসো আইনের ৬ নম্বর ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। আগামী ২০ জুলাই ফের দুই অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে, নাবালিকাকে জীবিত অবস্থাতেই বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, রিপোর্টে ফুসফুসে কাদাজল পাওয়া গিয়েছে। যা থেকে অনুমান করা হচ্ছে জলে পড়ার সময় নাবালিকা জীবিত ছিল। তার আগে তাকে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হতে হয়। যৌনাঙ্গে একাধিক আঘাতের চিহ্নের পাশাপাশি মাথাতেও গুরুতর আঘাতের প্রমাণ মিলেছে।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত রক্তক্ষণ এবং জলে ডুবে শ্বাসরোধ, এই দুই কারণ মিলেই মৃত্যু হতে পারে। প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা গোটা ঘটনার পুনর্নির্মাণের চেষ্টা চলছে। এখনও পর্যন্ত তদন্তে যা উঠে এসেছে, তাতে ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলেই সন্দেহ করা হচ্ছে।




