• facebook
  • twitter
Monday, 18 May, 2026

৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ মামলা সুপ্রিম কোর্টে গ্রহণ সব পক্ষের জবাব তলব, শুনানি আগস্টে

বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার বেঞ্চ এই মামলায় নোটিস জারি করেছে

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক স্কুলে ৩২ হাজার শিক্ষকের নিয়োগ ঘিরে চলা মামলা এবার দেশের শীর্ষ আদালতে পৌঁছল। সোমবার এই সংক্রান্ত মামলা গ্রহণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়ের বিরুদ্ধে বঞ্চিত প্রার্থী তথা মূল মামলাকারীরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। এর আগে কলকাতা হাইকোর্ট তাদের রায়ে জানিয়েছিল, ৩২ হাজার নিযুক্তের সকলেই যে দুর্নীতিতে যুক্ত তা তদন্তে প্রমাণ হয়নি।

কয়েকজন অযোগ্যের জন্য সকলের চাকরি কেড়ে নেওয়া উচিত নয়।বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার বেঞ্চ এই মামলায় নোটিস জারি করেছে। আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পরবর্তী শুনানি হতে পারে। তবে এই পর্যায়ে কোনও অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ না দেওয়ায় আপাতত চাকরিতে বহাল থাকছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।  

Advertisement

সোমবার সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানির সময় বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘যাঁরা আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন, তাঁদের সেই উপযুক্ত যোগ্যতা এবং সঠিক প্রশিক্ষণ আছে কিনা, তা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। সেটা জানতে চাই আমরা৷’  শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাদারী প্রশিক্ষণ নিয়ে কোনও রকম আপস করা চলে না বলেই মনে করে শীর্ষ আদালত। আপাপত এই পর্যায়ে তিনি কোনওরকম অন্তবর্তী নির্দেশ বা অন্তবর্তী স্থগিতাদেশ দিচ্ছেন না। ফলে যারা এই মুহূর্তে যাঁরা চাকরিতে যে অবস্থায় বহাল আছেন, তেমনি থাকবেন।
২০১৪ সালের টেট পরীক্ষাকে ভিত্তি করে শুরু হওয়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ২০১৭ সাল থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে শুরু থেকেই একাধিক অভিযোগ ওঠে। মামলাকারীদের দাবি, নিয়োগের সময় পূর্ণাঙ্গ মেধাতালিকা প্রকাশ করা হয়নি এবং প্রক্রিয়ায় একাধিক অনিয়ম রয়েছে।  
 
টেট পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৪-র ৬ মার্চ। প্রায় ১৫ লক্ষ পরীক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। ২০১৫-র নভেম্বরে পরীক্ষায় বসেন প্রায় ১৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী। সেপ্টেম্বর ২০১৬-য় ফলপ্রকাশের পর দেখা যায় প্রায় ১ লক্ষ ২৪ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে কত নম্বর পেয়ে তাঁরা পাশ করেছেন, তার কোনও উল্লেখ ছিলনা। ৪২ হাজার ৪৪৯ শূন্যপদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় সেই সময়েই।
অক্টোবর থেকে শুরু হয় ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া। ২০১৭ থেকে শুরু হয় নিয়োগ। প্রথমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১১ হাজার এবং তার পর প্রশিক্ষণহীন প্রায় ৩২ হাজার প্রার্থী নিযুক্ত হন প্রাথমিক শিক্ষক হিসাবে। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, নিয়োগের সময় কোনও প্যানেল প্রকাশ হয়নি, এসএমএস-এ নিয়োগ হয়েছে রাতের অন্ধকারে।

মামলাকারী বঞ্চিতদের অভিযোগ, কারা চাকরি পেলেন, তা কেউ জানতে পারলেন না। শিক্ষা পর্ষদ সেই তালিকা প্রথম প্রকাশ করে ২০২২-এ। ২০১৪ টেট পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর তখনই প্রথম জানতে পারেন প্রার্থীরা। নিয়োগের মেধাতালিকাও প্রকাশ করা হয়। তালিকা প্রকাশের পর প্রশিক্ষণহীন ও কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীদের বেআইনিভাবে নিয়োগের অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছিলেন ১৪০ জন চাকরিপ্রার্থী। এই মামলায় প্রধান মামলাকারী ছিলেন প্রিয়াঙ্কা নস্কর।

Advertisement

২০২৩ সালের ১২ মে কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সিঙ্গল বেঞ্চ ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল। পরে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যায়। সেখানেও সিঙ্গল বেঞ্চের রায় বহাল ছিল।
এর পরে সরকার, পর্ষদ ও কর্মরত শিক্ষকেরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। সেখানেই অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। এর পরে মামলা ফের ঘুরে আসে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চে। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর মামলার শুনানি শেষ হয়। সেই মামলারই রায় ঘোষণা হয় ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর, যেখানে হাইকোর্ট কর্মরত শিক্ষকদের পক্ষে রায় দেয়।
কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রায় দিয়েছিল ৩২ হাজার কর্মরত প্রাথমিক শিক্ষকদের পক্ষে। জানিয়েছিল, ৩২ হাজার শিক্ষকের সকলেই যে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তা তদন্তে প্রমাণ করা যায়নি। দুর্নীতির উৎসও প্রমাণ করা যায়নি। কয়েক জন ‘অযোগ্য’ শিক্ষকের জন্য সমস্ত প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি কেড়ে নেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। তার পরেই সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বঞ্চিতরা।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণের ফলে বিষয়টি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে পরবর্তী শুনানিতে সমস্ত পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে বলে জানা গিয়েছে। এই মামলাকে ঘিরে রাজ্যের শিক্ষা মহল ও রাজনৈতিক মহলের  নজর এখন শীর্ষ আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই।

Advertisement