পশ্চিমবঙ্গকে শিল্প, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে রাজ্যের শুভেন্দু অধিকারী সরকার। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই চলতি বিধানসভা অধিবেশনে আনা হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। যা সাধারণভাবে ‘গুন্ডা দমন বিল’ নামে পরিচিত। আগামী সোমবার বিধানসভায় এই বিল পেশ হওয়ার কথা। বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের দাবি, রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা আরও মজবুত করতে এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই এই আইন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই আইনের লক্ষ্য হল, সমাজবিরোধীদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং রাজ্যে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।
শনিবার রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত স্পষ্ট জানান, একটি রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ। বিনিয়োগকারীরা তখনই কোনও রাজ্যে শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হন, যখন তাঁরা নিশ্চিত হন যে সেখানে তোলাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস বা অপরাধচক্রের কোনও প্রভাব নেই। সেই কারণেই প্রস্তাবিত গুন্ডা দমন বিলকে তিনি রাজ্যের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার বলে মনে করছেন।
অর্থমন্ত্রীর কথায়, ‘গত কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ নানা ধরনের রাজনৈতিক হিংসা, সন্ত্রাস এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সাক্ষী থেকেছেন। তোলাবাজি, চাঁদার জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন মানুষ। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই বর্তমান সরকার মনে করছে, সময়ের দাবি মেনে অপরাধ দমনে আরও কঠোর ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বা অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোনওটিই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।’
তবে এই বিল নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্নও উঠেছে। বিরোধীদের একাংশের আশঙ্কা, কঠোর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপব্যবহারের সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে। যদিও সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা এই আইনের উদ্দেশ্য নয়। বরং এই আইন শুধুমাত্র সমাজবিরোধী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
শুভেন্দু সরকারের দাবি, গুন্ডা দমন আইন কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নয়, এটি বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাংলাকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তাই রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে এই বিলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবেই তুলে ধরছে সরকার। এই প্রেক্ষিতেই রাজ্যের বিগত বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে একযোগে নিশানা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘গত ৫০ বছরে এই রাজ্যের মানুষের এক ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে।’
এদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানেও শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, শুধু শিল্প বা বাণিজ্যের উন্নতি করলেই হবে না, শিক্ষাক্ষেত্রের মানোন্নয়নও সমান জরুরি। কারণ, একটি উন্নত রাজ্য গড়ে তুলতে নিরাপত্তা, শিল্প এবং শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাসের কথা স্মরণ করে তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটা বিরাট বড় ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও গরিমা আছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, বর্তমানে এর অবস্থা শোচনীয়। এশিয়ার অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র হওয়া তো দূর অস্ত, ভারতবর্ষের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির তালিকাতেও কলকাতা আজ অনেক নিচে নেমে গিয়েছে।’




