ডিম এখন রাজনীতির হাতিয়ার।
এক সময় ছিল যখন স্কুলের খিচুড়ি আর ডালভাতই মিড ডে মিলের মানদণ্ড ছিল। তারপর এল ডিম, সপ্তাহে একদিন। দরিদ্র ঘরের শিশুর পাতে প্রোটিনের সেই ছোট্ট আলো। আর এখন সেই ডিমকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতি উত্তাল।
রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বাজেটে ঘোষণা করলেন, কলকাতা পুরনিগম (KMC) এলাকার স্কুলগুলিতে মিড ডে মিল রান্না করে দেবে ইসকন। প্রাথমিক স্তরে বরাদ্দ বাড়ল ৬ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে ১০ টাকায়। মানে প্রায় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি। ঘোষণাটার মধ্যে বাচ্চাদের পুষ্টির কথা যতটা, তার চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
বিরোধীরা বলছে, পাত থেকে ডিম তুলে নিলে শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগবে। তৃণমূলের রাজ্যসভার সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন তো বলেই দিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বীকে ডিম ছোঁড়া চলে, কিন্তু বাচ্চার পাত থেকে ডিম সরিয়ে নিলে চলে না। প্রশ্ন হল, তিনি যা বলছেন, সেটা আদৌ বিজ্ঞানসম্মত কিনা।
আসলে কী খাবে পড়ুয়ারা?
ইসকন কলকাতার মুখপাত্র রাধারমণ দাস জানিয়েছেন, ইসকনের অন্নমিত্র ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে খাবার দেওয়া হবে। মেনুতে থাকবে ভাত, ডাল, সবজি এবং মিষ্টি। রান্না হবে সাত্ত্বিক রীতিতে। অর্থাৎ পেঁয়াজ, রসুন, ডিম, মাছ, মাংস কিছুই থাকবে না। এর পরিবর্তে প্রোটিনের জন্য থাকবে পনির, সয়াবিন, রাজমা, ছোলা এবং নানা ধরনের ডাল।
এই মুহূর্তে KMC এলাকার প্রায় ১,৮০০টি প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক স্কুলের প্রায় ১ লক্ষ পড়ুয়াকে মিড ডে মিল দেওয়ার লক্ষ্য। ইসকন ইতিমধ্যে কলকাতায় প্রায় ১৬০টি স্কুলে খাবার দিয়ে থাকে।
তা হলে বিজ্ঞান কী বলছে? ডিম আদৌ অপরিহার্য?
এই প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার আগে কিছু বুনিয়াদি তথ্য জানা দরকার।
প্রোটিনের মান পরিমাপ করা হয় ‘বায়োলজিক্যাল ভ্যালু’ বা BV দিয়ে। ডিমের BV ১০০, অর্থাৎ এটি হল প্রোটিনের নিখুঁত মান। শরীর ডিমের প্রোটিন প্রায় সম্পূর্ণটাই ব্যবহার করতে পারে। ডিমে আছে ৯টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড। পাশাপাশি আছে ভিটামিন B12, ভিটামিন D এবং কোলিন, যা মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে।
তা হলে কি বলা যাবে, ডিম বাদ দিলে শিশুর পুষ্টি মার খাবে?
প্রশ্নটির সরাসরি জবাব, না।
কারণ ইসকন যে বিকল্পগুলির কথা বলছে, সেগুলো মোটেই দুর্বল প্রোটিন উৎস নয়।
পনিরের BV ৮০ থেকে ৮৬। মানে ডিমের তুলনায় সামান্য কম, কিন্তু পনিরে প্রতি ১০০ গ্রামে থাকে ১৮ থেকে ২৫ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন। পনিরও একটি ‘কমপ্লিট প্রোটিন’, অর্থাৎ এতেও আছে সমস্ত অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড।
সয়াবিন তো আরও শক্তিশালী। প্রতি ১০০ গ্রামে থাকে ৩৬ গ্রামের বেশি প্রোটিন। সয়া হল উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের মধ্যে একমাত্র যেটি নিজেই কমপ্লিট প্রোটিন। সয়া চাংকস বা বড়ি শিশুদের খাওয়ানো তেমন অসম্ভবও নয়।কারণ ঠিকমতো রান্না হলে, তা উপাদেয়।
এবার আসা যাক অন্য খাতে। এক কাপ রান্না করা ডাল থেকে মেলে প্রায় ১৫ গ্রাম প্রোটিন। রাজমা, ছোলা, মুগ, মসুর, অড়হর, চানা, বিউলি… এমন সব শস্যের প্রতিটিতেই প্রচুর প্রোটিন। এগুলো অসম্পূর্ণ প্রোটিন কারণ এগুলিতে কোনও কোনও অ্যামিনো অ্যাসিড কম থাকে। কিন্তু ভাতের সঙ্গে ডাল খেলে সেই ফাঁকটা পূরণ হয়ে যায়। তাই ভারতীয় ‘ডাল-ভাত’ শুধু একটি ঐতিহ্য বা অভ্যাস নয়, পুষ্টিবিজ্ঞানেও পরীক্ষিত সমন্বয়।
ICMR যেমন ২০২৪ সালের পুষ্টি নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলেছে, শস্য এবং ডাল ৩:১ অনুপাতে মেলালে প্রোটিনের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
পরিমাণেও কি মিলবে?
PM POSHAN প্রকল্পের নির্ধারিত মান অনুযায়ী, প্রাথমিক স্কুলের শিশুকে প্রতি মিড ডে মিলে কমপক্ষে ৪৫০ ক্যালোরি এবং ১২ গ্রাম প্রোটিন পেতে হবে। উচ্চপ্রাথমিকে সেটা ৭০০ ক্যালোরি এবং ২০ গ্রাম।
এই লক্ষ্যমাত্রা কি শুধু নিরামিষ খাবারে পূরণ হতে পারে?
হ্যাঁ, পারে। তবে শর্ত হল, মেনু তৈরি করতে হবে ভেবেচিন্তে।
ইসকন বলছে, তাদের পুষ্টিবিদরা মেনু তৈরি করছেন। রাজ্যের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থানীয় রুচির কথা মাথায় রাখা হবে। যদি সত্যিই ডাল, ভাত, সয়া বা পনির এবং মরসুমি সবজির সমন্বয় ঘটানো যায়, তা হলে পুষ্টির নির্ধারিত মান ছুঁয়ে ফেলা কঠিন নয়।
বিজ্ঞানের ভাষায় বললে, ডিম অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। ডিম সহজলভ্য এবং সস্তা, কিন্তু ডিমই একমাত্র পথ নয়।
বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা যেমন স্পষ্টই দ্য স্টেটসম্যানকে জানিয়েছেন, নিরামিষ খাবার নিয়ে সম্পূূর্ণ ভিত্তিহীন কথা প্রচার করছে বিরোধীরা।
আসল লড়াই: স্বাস্থ্যসম্মত রান্না বনাম বিশৃঙ্খলা
বিতর্কের মূল জায়গাটা আসলে ডিমে নয়, রান্নাঘরে।
কলকাতার বেশিরভাগ স্কুলে মিড ডে মিল রান্না হয় স্থানীয় স্ব-সহায়ক গোষ্ঠীর (SHG) হাতে। রান্নাঘর প্রায়ই ছোট, অপরিচ্ছন্ন। কাঁচামালের মান নিয়ন্ত্রণ হয় না। দুর্নীতির অভিযোগ পুরনো।
ইসকনের পদ্ধতি একেবারে আলাদা। কেন্দ্রীয় রান্নাঘর থেকে রান্না হবে শিল্পস্বীকৃত স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে। প্রতিটি পাত্রে থাকবে স্বাস্থ্যসম্মত সিলযুক্ত প্যাকেজিং। ইসকন ইতিমধ্যে কর্ণাটক, ওডিশা-সহ একাধিক রাজ্যে লক্ষাধিক শিশুকে প্রতিদিন খাবার পরিবেশন করছে।
সংস্থার দাবি, তারা দেশজুড়ে প্রায় ১২ লক্ষ পড়ুয়াকে প্রতিদিন মিড ডে মিল দেয়। পরিসংখ্যানটা নেহাত ছোট নয়।
বরাদ্দ বেড়ে ১০ টাকা হওয়ায় এখন মানসম্পন্ন পনির বা সয়া কেনা সম্ভব হবে, যেটা আগের ৬ টাকা ৭৮ পয়সায় ছিল না।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম বাংলার বাইরের নয়
বিরোধীরা বলছেন, নিরামিষ খাবার বাঙালির সংস্কৃতির বাইরে। কিন্তু এই যুক্তিতে একটা বড় ফাঁক আছে।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব ঐতিহ্যের জন্ম এই বাংলায়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নদিয়ার সন্তান। মাছ-ভাতের পাশে এই রাজ্যেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে নির্জলা একাদশীর ব্রত, অন্নপ্রাশনের নিরামিষ ভোগ, পুজোর নৈবেদ্যের সাত্ত্বিক আহার। ইসকনের মুখপাত্র রাধারমণ দাসের কথায়, গৌড়ীয় বৈষ্ণব ঐতিহ্য বাংলায় জন্ম নিয়েছে। নিরামিষ খাবারকে এখানে বহিরাগত বলা ঐতিহাসিকভাবে ভুল।
রাজনৈতিক হিসেব
বিরোধীদের আপত্তি কতটা পুষ্টির জন্য, কতটা রাজনীতির জন্য?
তৃণমূল কংগ্রেসই বছরের পর বছর মিড ডে মিলে দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ হয়েছে। শিক্ষক ও স্কুলের কথা বলতে গিয়ে বারবার যে SHG মডেলের কথা আসছে, সেখানে দলীয় রাজনীতির অনৈতিক প্রভাবের কথা বাংলায় অজানা নয়। এখন সেই SHG হাতছাড়া হওয়ার ভয়েই কি ডিমের নামে আওয়াজ উঠছে?
শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন স্পষ্ট বলেছেন, পরিকল্পিত নিরামিষ ডায়েট শিশুর পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। ডিমই একমাত্র পুষ্টির উৎস, এই ধারণা বিজ্ঞান-সমর্থিত নয়। এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়ার মতো তথ্য বিরোধীদের হাতে নেই।
এর পরে কী?
ইসকন এখনও কলকাতায় কেন্দ্রীয় রান্নাঘরের জায়গা খুঁজছে। পাইলট প্রকল্প মাঠে নামতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগবে। শিক্ষা দফতর মেনু পর্যালোচনা করবে পুষ্টিবিদদের নিয়ে।
প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে। পরিকল্পনা মেনে মেনু কার্যকর হচ্ছে কিনা, শিশুরা সেই খাবার গ্রহণ করছে কিনা এবং পুষ্টিমান বাস্তবিকই অর্জিত হচ্ছে কিনা।
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। সেই উত্তর মিলবে কয়েক মাস পরে, মাঠ থেকে।
কিন্তু এখন একটা কথা পরিষ্কার। ডিম ছাড়া বাচ্চা বড় হয় না, এই দাবি বিজ্ঞান সমর্থন করে না। সঠিক পরিকল্পনায়, সঠিক বরাদ্দে, ইসকনের মতো অভিজ্ঞ সংস্থার হাতে নিরামিষ মিড ডে মিল শিশুর পুষ্টির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারে। আর স্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না হওয়া পরিষ্কার খাবার, যেটা এতদিন ছিল না, সেটা তো বাড়তি পাওনা।




