তরুণ নেতা প্রতীক উর রহমানকে ঘিরে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)র অন্দরে। জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের কর্মপদ্ধতিতে অসন্তোষ জানিয়ে ইস্তফার ইঙ্গিত দেওয়ার পর থেকেই আলোড়ন শুরু হয়েছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে দলে ধরে রাখতে উদ্যোগী হয়েছেন দলের প্রবীণ নেতা বিমান বসু।
প্রসঙ্গত, এর আগে প্রাক্তন নেতা হুমায়ুন কবীরর সঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমর বৈঠক ঘিরে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রতীক উরের পদত্যাগপত্র নতুন করে চাপে ফেলেছে দলকে। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতীক উর রহমান তাঁর ইস্তফাপত্রে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বর্তমান নেতৃত্বের কাজের ধরন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতির সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেন না। সেজন্য তিনি শুধু রাজ্য কমিটি ও জেলা কমিটির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নয়, দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তাঁর এই পদক্ষেপে দলের অন্দরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
Advertisement
এই চিঠির ভাষাতেই স্পষ্ট, দলের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্রিয় বিমান বসু। মঙ্গলবার প্রতীক উর স্বীকার করেন, বিমানের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং তাঁকে দলের রাজ্য দপ্তরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে তিনি এখনই সেখানে যাচ্ছেন না বলেই জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছি।’
Advertisement
দলীয় দপ্তর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে প্রতীক উর আদৌ আসবেন কি না, তা নিয়ে ধন্দ অব্যাহত রয়েছে। বুধবার রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক এবং তার পরবর্তী সময়ে রাজ্য কমিটির সভা রয়েছে। সেই বৈঠকে প্রতীক উর উপস্থিত থাকবেন কি না, তা নিয়েও কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি।
দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রতীক উর দলের ভিতরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, ‘এই প্রশ্নগুলির সন্তোষজনক উত্তর না পেলে তাঁর পক্ষে দলে থাকা কঠিন হবে।’ আবার বিমান বসুর সঙ্গে বৈঠকের পরও যদি পরিস্থিতির সমাধান না হয়, তা হলে তা দলীয় মহলে আরও বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দলের মধ্যে প্রতীক উরকে ঘিরে এই তৎপরতার পিছনে রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়। দক্ষিণ ২৪ পরগণার গ্রামীণ এলাকা থেকে উঠে আসা প্রতীক উর এক সাধারণ মুসলিম পরিবার থেকে রাজ্য কমিটির নেতা হয়েছেন। তিনি দলের ছাত্র সংগঠন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার রাজ্য সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক সমাজ থেকে উঠে আসা প্রতীক উরের মতো নেতার দলত্যাগ সিপিএমের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যখন দলের রাজ্য সম্পাদক নিজেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, তখন এই ধরনের পদক্ষেপ দলের সামাজিক বার্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
গত লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন প্রতীক উর। বিরোধী রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় থাকার জন্য তিনি দলীয় কর্মীদের মধ্যে ‘লড়াকু নেতা’ হিসাবেই পরিচিত।
দলীয় মহলের একাংশ মনে করছে, গত কয়েক দশকে সিপিএমের মধ্যে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু অংশের প্রতিনিধিত্ব কমেছে। অতীতে সইফুদ্দিন চৌধুরী, মইনুল হাসান, আব্দুস সাত্তারের মতো সংখ্যালঘু নেতাদের দলত্যাগের নজির রয়েছে। এমনকি দক্ষিণ ২৪ পরগণারই নেতা রেজ্জাক মোল্লা দল ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভার সদস্য হন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতীক উরের সম্ভাব্য দলত্যাগকে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসাবেই দেখছে সিপিএমের একাংশ। তবে এখনও পর্যন্ত তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি। তাঁর ঘনিষ্ঠদের কথায়, ‘রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প। প্রতীক উর সব দিক ভেবেচিন্তেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।’ এখন নজর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের দিকে। তরুণ নেতার সঙ্গে দলের মতপার্থক্য মিটবে, নাকি সিপিএম আর এক প্রভাবশালী মুখ হারাবে— এই প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই।
Advertisement



