ধর্মনিরপেক্ষ, উন্নত এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন খালেদাপুত্র তারেক রহমান। বাংলাদেশের জনতা তাঁকে বিপুল পরিমাণে ভোট দিয়ে সেই স্বপ্নপূরণের পথ মসৃণ করে দিয়েছে। স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে মঙ্গলবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথ পড়ান। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই শপথ অনুষ্ঠান হয়।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকারে ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। ২০ বছর বাদে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করছে দলটি। আর ৩৫ বছর বাদে একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে বাংলাদেশ। বিএনপি সরকারের মন্ত্রীসভায় আছেন ৫০ জন। এর মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। টেকনোক্র্যাট তিনজন।
Advertisement
এবারের মন্ত্রীসভায় অনেক নতুন মুখ রয়েছে। এঁরা কেউ আগে কখনও মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হননি। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রীসভায় জায়গা করে নেওয়া নেতাও আছেন। মন্ত্রীদের ২৫ জনের মধ্যে ১৭ জনই নতুন মুখ। প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ২৪ জনই নতুন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এবারই প্রথম মন্ত্রীসভার সদস্য হচ্ছেন।
Advertisement
নতুন মন্ত্রীসভায় থাকছেন তিন জন মহিলা। তাঁদের মধ্যে এক জন পূর্ণমন্ত্রী হচ্ছেন। দু’জন প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন। পূর্ণমন্ত্রী হচ্ছেন আফরোজা খানম রিতা। প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন ফারজানা শারমিন পুতুল এবং শামা ওবায়েদ। নতুন মন্ত্রীসভায় স্থান পাচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানও। তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার জন্য ফোন পান।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৬(২) অনুসারে, সে দেশের প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীসভায় সংসদের সদস্য নন এমন ব্যক্তিদেরও নিয়োগ করতে পারেন। তবে তাঁদের সংখ্যা হবে মন্ত্রীসভার মোট সদস্যের মাত্র এক-দশমাংশ। একেই বলা হয় টেকনোক্র্যাট কোটা। কোনও বিশেষ বিষয়ের উপর ব্যুৎপত্তি থাকা ব্যক্তিকেই এই কোটায় মন্ত্রীসভায় স্থান দেওয়া হয়।
এবারের মন্ত্রীসভায় দু’জন সংখ্যালঘু মন্ত্রী হচ্ছেন। তাঁরা হলেন নিতাই রায় চৌধুরী এবং দীপেন দেওয়ান। নিতাই রায় চৌধুরী মাগুরা-২ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বেয়াই তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এরশাদের জমানাতে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মন্ত্রী। অন্যজন হলেন পাহাড়ি এলাকা থেকে বিজয়ী চাকমা সম্প্রদায়ের নেতা দীপেন দেওয়ান। তাঁকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২১২টিতে জয়ী হয়েছে বিএনপি। এ বার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মাত্র সাত জন মহিলা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছ’জনই বিএনপি-র প্রার্থী ছিলেন। এক জন ছিলেন নির্দল প্রার্থী। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশে যথাক্রমে ১৮, ২৩ ও ১৯ জন মহিলা সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মন্ত্রী হওয়ার জন্য মন্ত্রীপরিষদের ফোন পেয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল আওয়াল মিন্টু, এ জে এম জাহিদ হোসেন, মিজানুর রহমান মিনু, মহম্মদ আসাদুজ্জামান, আফরোজা খানম রিতা, নিতাই রায় চৌধুরী। প্রথমবার সংসদ সদস্য হলেও মন্ত্রী হওয়ার জন্য ডাক পেয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী।
এখনও পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী হিসাবে ডাক পেয়েছেন ১৫ জন। তাঁরা হলেন এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত), শরীফুল আলম, মীর শাহে আলম, ফরহাদ হোসেন আজাদ, শামা ওবায়েদ, কায়সার কামাল, মীর শাহে আলম, জোনায়েদ সাকি, জাকারিয়া তাহের (সুমন), ইশরাক হোসেন, আমিনুর রশীদ ইয়াছিন, ফারজানা শারমিন পুতুল, নুরুল হক নুর। টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ডাক পেয়েছেন আমিনুল হক।
তবে বিএনপির এই বিপুল ভোটে জয় উপমহাদেশে একটি স্বস্তির বাতাস বইয়ে দিয়েছে। কট্টর ভারতবিরোধী মৌলবাদী শক্তির পরাজয় ঘটেছে। মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে আওয়ামী লীগকে ‘নিষিদ্ধ’ করে ভোট থেকে সরিয়ে রেখেছিল, তাতে মনে হয়েছিল নারীবিদ্বেষী মৌলবাদী শক্তি এবং রাজাকারদের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা চলে যাবে। ইউনূস চাইলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সেটা হতে দেয়নি। ভোটের আগে বাইনারি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আপনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, না কি বিরুদ্ধে? বিএনপি ৪৯.৪৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বিএনপি তথা তারেকের জয়কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে চেতনার জয় বলেই মনে করা হচ্ছে।
জয়ের পর ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে তারেক রহমান সাংবাদিক বৈঠক করেন। কথাবার্তায় তাঁর সংযম ধরা পড়ে। যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়পড়তা রাজনীতিবিদদের মতো নয়। তবে তাঁর কথা এবং কাজের সাযুজ্য কতটা– তা আগামী দিনে বোঝা যাবে।
Advertisement



