সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে বুধবার বিধানসভায় ঢোকেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁকে প্রথামাফিক গার্ড অফ অনার দেওয়া হয়। বিধানসভা চত্বরে ড. বি. আর. অম্বেডকরের মূর্তিতে মাল্যদান করে তিনি মুখ্যমন্ত্রী কক্ষে যান এবং সেখানে পূজার্চনা করেন।
এরপর মুখ্যমন্ত্রী অধিবেশন কক্ষে গিয়ে প্রথম বিধায়ক হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান প্রোটেম স্পিকার তথা মানিকতলার বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়। সূত্রের খবর, শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ফলে নন্দীগ্রাম আসন তিনি ছেড়ে দিচ্ছেন বলে খবর। এরপরেই দিনভর তাঁকে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়।
Advertisement
তপসিয়ার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার জেরে রাজ্য জুড়ে অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শহরের যেসব কারখানা বেআইনি ভাবে চলছে, সেগুলির বিদ্যুৎ ও জল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি, তিলজলায় যে বহুতলে আগুন লেগেছিল, সেটি অবৈধ নির্মাণ বলে দাবি করে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশও দিয়েছে সরকার।
Advertisement
মঙ্গলবার তিলজলা থানার অন্তর্গত তপসিয়ার ওই অগ্নিকাণ্ডে দু’জনের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর বুধবার সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরপর নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিতে চলেছে।
শুভেন্দু বলেন, ‘তিলজলার ঘটনা নিয়ে চারটি দপ্তরের সমন্বয়ে আমরা একটি কমিটি গড়়েছিলাম। সকালেই তার রিপোর্ট দিতে বলেছিলাম। কমিটির রিপোর্টে যা পাওয়া গিয়েছে, তা রাজ্যের ক্ষেত্রে, কলকাতার ক্ষেত্রে অশনিসঙ্কেত।’
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কারখানার কোনও অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান ছিল না। এমনকি অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সেখানে অনুপস্থিত ছিল। সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে কারখানাটি পরিচালিত হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
সরকার ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কারখানার বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ করেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাকে ওই কারখানার সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিইএসসি-কে বিদ্যুৎসচিবের মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কসবা, তিলজলা, মোমিনপুর ও একবালপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ কারখানাগুলির অভ্যন্তরীণ অডিট করে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিতে।
এ ছাড়া পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরকে এক দিনের মধ্যে অবৈধ কাঠামো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে পুরসভাকে সেই কাজ করতে বলা হয়েছে। বিপজ্জনক ও বেআইনি কারখানাগুলিতে জলের লাইনও বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই বিষয়ে সরকারের নীতি ‘জিরো টলারেন্স’।
সেই সঙ্গে রাজ্যের পুরসভা ও পুরনিগম এলাকাগুলিতে নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে চলেছে সরকার। বুধবার বিধানসভায় এমনটাই জানিয়েছেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও তাঁর এ বিষয়ে কথা হয়েছে বলে জানান অগ্নিমিত্রা। তিনি বলেন, রাজ্যে সাতটি পুরনিগম, ১২১টি পুরসভা এবং তিন শিল্পাঞ্চলকে এ বার মুড়ে ফেলা হবে সিসি ক্যামেরায়।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পুরো নজরদারি ব্যবস্থা সরাসরি পুর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, প্রতিটি পুরসভা ও পুরনিগম এলাকায় কী কাজ হচ্ছে, কীভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে—সবকিছুর উপর কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি চালানো হবে। অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘পুর দপ্তর থেকেই সরাসরি মনিটরিং করা হবে। প্রতিটি পুর এলাকার কার্যকলাপ আমরা খুব কাছ থেকে দেখতে চাই।‘
মন্ত্রী আরও জানান, শুধু শহর বা এলাকাই নয়, পুরসভা ও পুরনিগমের দপ্তরগুলিও এই নজরদারির আওতায় আসবে। তাঁর কথায়, ‘কে কখন অফিসে ঢুকছেন, কে বেরোচ্ছেন, অফিসের সময় ঠিকমতো মানা হচ্ছে কিনা—সবকিছুর উপর এখন থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ নজর থাকবে।‘
অগ্নিমিত্রা দাবি করেন, এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং সেই আলোচনার ভিত্তিতেই এই নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
এদিন তিনি আরও বলেন, যেসব পুরসভা এলাকায় এখনও নির্বাচন হয়নি, সেগুলিতে দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করতেই এই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এদিন দুর্নীতি রুখতেও কড়া অবস্থান নিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য মন্ত্রীসভা। বুধবার সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরের দুর্নীতিতে অভিযুক্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে সিবিআই-সহ আদালত নির্দেশিত তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে প্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, পূর্ববর্তী সরকার বহু ক্ষেত্রে এই অনুমতি আটকে রেখেছিল, ফলে তদন্তের প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছিল। নতুন সরকার সেই বাধা দূর করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে, সেই আস্থা রক্ষা করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তাই কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিককে রেহাই দেওয়া হবে না। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, পুরসভা নিয়োগে অনিয়ম এবং সমবায় সংক্রান্ত দুর্নীতির মতো একাধিক মামলায় যুক্ত সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তদন্তে ছাড়পত্র দিয়েছে মন্ত্রীসভা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আগের সরকার দুর্নীতিতে জড়িত কিছু আমলাকে রক্ষা করার উদ্দেশে তদন্তকারী সংস্থার কাজে বাধা সৃষ্টি করেছিল। সেই কারণেই বহু মামলায় চার্জশিট দাখিলের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন আটকে ছিল। এখন রাজ্য সরকারের অনুমতি মেলার ফলে তদন্তকারী সংস্থাগুলি আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে।
উল্লেখ্য, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনও কর্মরত রাজ্য সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত বা চার্জশিট দাখিল করতে হলে সরকারের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন হয়। এতদিন সেই অনুমতির অভাবে একাধিক তদন্ত ঝুলে ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির তদন্তে আর প্রশাসনিক বাধা রইল না বলে মনে করা হচ্ছে।
Advertisement



