ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক খুনের প্রতিবাদে শুক্রবার ও শনিবার দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বেলডাঙা। পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ মানুষের একাংশ। এর মাঝেই চলে ভাঙচুর, তাণ্ডব। রবিবার সকাল থেকে বেলডাঙার পরিস্থিতি থমথমে। জায়গায় জায়গায় চলছে পুলিশের টহল। সেই সঙ্গে রুটমার্চ করা হচ্ছে। জমায়েত দেখলেই তা সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গোটা ঘটনায় এখনও অবধি কমপক্ষে ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর।
তবে সকাল থেকে শিয়ালদহ-লালগোলার আপ ও ডাউন শাখায় সমস্ত ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে চলেছে, দাবি পূর্ব রেলের। রেল জানিয়েছে, ট্রেন ঠিকমতো চলছে। নতুন করে ১২ নম্বর জাতীয় সড়কও অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি। মুর্শিদাবাদ জেলার এসপি কুমার সানি রাজ বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। পুলিশের রুটমার্চ চলছে। যারা ঝামেলা করেছিল, তাদের প্রায় সকলকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বেলডাঙা, রেজিনগরে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক।’
Advertisement
এ দিন বেলডাঙা বড়ুয়া মোড়, ছাপাখানা মোড়, পাঁচরাহা মোড়ের দোকানপাট খুলেছে। সেই সঙ্গে চলছে জনবহুল ও গুরত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের টহলদারি। এ দিন সকাল থেকে নতুন করে কোনও উত্তেজনার খবর নেই। যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। বড়ুয়া মোড় থেকে বহরমপুরগামী সমস্ত অটো-ট্রেকার চলছে। বেলডাঙার এসডিপিও উত্তম গড়াই জানিয়েছেন, ‘সমাজমাধ্যম, বেলডাঙার প্রতিটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দোষীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। নতুন করে গ্রেপ্তারের সংখ্যা না বাড়লেও বেশ কিছু দোষীকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।’
Advertisement
এসডিপিও জানান, ধৃতদের বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানো, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, জাতীয় সড়ক অবরোধ, আগুন লাগানো, পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টি করা-সহ বিভিন্ন জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করা হয়েছে। এসডিপিও বলেন, ‘দলমত নির্বিশেষে গ্রেপ্তার করা হবে। ফলে রাজনৈতিক দলের নেতাদের থানায় যেতে নিষেধ করছি। এ ক্ষেত্রে কাউকে রেয়াত করা হবে না।’
এ দিন আলাউদ্দিন শেখের পারিবারের সঙ্গে দেখা করেন বহরমপুরের সাংসদ ইউসুফ পাঠান। সঙ্গে ছিলেন বেলডাঙার বিধায়ক হাসানুজ্জামান ও দলীয় নেতৃত্ব। ইউসুফ বলেন, ‘বেলডাঙা-সহ মুর্শিদাবাদ থেকে প্রচুর পরিযায়ী শ্রমিক বাইরে কাজ করতে যান। অনেককেই বাইরের রাজ্যে হেনস্থা করা হয়। ওঁরা আমাদের দেশের নাগরিক। ওঁরা সেই রাজ্যের উন্নয়নের জন্যেও তো কাজ করছেন। এরকম ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেটাই চাইব।’
পরিবারের সদস্যরা তাঁকে কাছে পেয়ে নিজেদের সংকটের কথা খুলে বলেন। এতদিন এত অশান্তির মাঝে কেন সাংসদকে দেখা যায়নি, এনিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জবাবে ইউসুফ পাঠান বলেন, ‘আমি এখানেই ছিলাম। এখানকার মানুষজনের সঙ্গে তৃণমূল স্তরে আমাদের সর্বদা যোগাযোগ আছে। আমি তাঁদের জন্যই কাজ করি। মানুষজন এবং সংবাদমাধ্যমকে ভুল বোঝানো হয়েছে। এখনও আমরা সবরকমভাবে এই পরিবারের পাশে আছি।‘
বেলডাঙায় থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে, বহরমপুরের শনিবার রোড শো করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বেলডাঙা অশান্তির নেপথ্যে বিজেপির উসকানিকে দায়ী করেছেন তিনি। নাম না করে নিশানা করেছেন দল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকেও। এ প্রসঙ্গেই অভিষেক বলেন, ‘বেলডাঙায় যে পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুতে এত প্রতিবাদ হচ্ছে, তাঁর বাড়িতে বারবার যেতে চাইছেন ইউসুফ। আমাকে জানিয়েছেন। আমিই তাঁকে বলেছি, এখন নয়, পরিস্থিতি শান্ত হলে দলের কর্মীদের নিয়ে ওখানে যেতে।‘
বেলডাঙার সুজাপুরের তাতলাপাড়ায় নিহত শ্রমিক আলাউদ্দিনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূল সাংসদ বলেন, ‘যা ঘটেছে, তা খুবই দুঃখজনক। দেশের পরিযায়ী শ্রমিকরা সকলে দেশের নাগরিক। রুটিরুজির জন্য হয়ত তাঁদের বাইরের রাজ্যে যেতে হয়। কিন্তু তাই বলে তাঁদের উপর এই অত্যাচার চলতে পারে না। আমি নিজে বারবার কেন্দ্রকে চিঠি লিখে এ বিষয়ে সতর্ক করেছি। এই পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর পর এখানে ভুল বোঝানো, উসকানি চলেছে সমানে। এখন পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত।আমি বরাবর এখানের মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। আমরা সবসময় তৃণমূল স্তরে কাজ করি। নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিবারের দেখভাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি, বাচ্চাদের শিক্ষা এবং অন্যান্য যা সাহায্য লাগে, আমরা সবই করব।‘
মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি এবং পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা আগেই ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। বেলডাঙার বিধায়ক হাসানুজ্জামান শেখ বলেন, ‘এই মানুষগুলো তো রক্ত-মাংসের মানুষ। এখানে থেকে বাইরের রাজ্যে কাজের জন্য যাচ্ছে। সেখানে হেনস্থা, মারধরের ঘটনা রোজ ঘটছে। সেই কারণেই মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে এই প্রতিবাদ করেছে।’
Advertisement



