আগামী ৭ মে বর্তমান রাজ্য সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তার আগে নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সেকথা মাথায় রেখে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জোরদার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। যতদূর জানা যাচ্ছে, বাংলায় তিন দফায় বিধানসভা নির্বাচন হবে। প্রথম দফার নির্বাচন হতে পারে, উত্তরবঙ্গের আট জেলায়। পরবর্তী পর্যায়ে, দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে দুই দফায় ভোট করার কথা ভাবছে কমিশন।
সেদিক থেকে দেখতে গেলে কলকাতা, হাওড়া, দুই ২৪ পরগনা, হুগলি, এবং সেই সঙ্গে নদিয়ায় দ্বিতীয় দফায় ভোট হতে পারে। তৃতীয় দফায় ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদে। ১৫ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ৩ দফায় ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই কারণে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের অফিসে।
আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি এ রাজ্যের জন্য চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে। এই চূড়ান্ত ভোটার তালিকাকে সামনে রেখেই রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে যাতে সম্পন্ন হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য কমিশন তৈরি হচ্ছে। তবে কোনও কারণে যদি রাজ্যে এক দফায় ভোট হয় তার জন্যেও রাজ্য নির্বাচন কমিশন তৈরি। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, এক দফায় ভোট ঘোষণা হলে তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
কারণ বিহারের মতো রাজ্যে যেখানে ২৪৩টি আসন রয়েছে সেখানে সম্প্রতি দুই দফায় ভোট হয়েছে। তাহলে পশ্চিমবঙ্গে যেখানে ২৯৪টি আসন রয়েছে সেখানে এক দফা ভোট কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিতে পারে এই রাজ্যের সিংহভাগ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। যদিও বিজেপি এ রাজ্যে এক দফায় ভোট করার পক্ষপাতী। কারণ এক দফায় ভোট হলে এ রাজ্যে হেভিওয়েট দুই শীর্ষ নেতানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে গোটা রাজ্যজুড়ে নির্বাচনী প্রচার করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে।
সব বিধানসভা আসনে নির্বাচনী প্রচারে দ্রুত পৌঁছানো তাঁদের পক্ষে কিছুটা হলেও সমস্যার কারণ হতে পারে বলে মনে করছে বঙ্গ বিজেপি নেতারা। অন্যদিকে, এ রাজ্যে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারে ভিন রাজ্য থেকে একঝাঁক হেভিওয়েট নেতানেত্রী বঙ্গে আসবেন এবং ভোট প্রচারে তাঁরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করবেন। স্বাভাবিকভাবেই এক দফায় ভোট হলে নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রে বিজেপির ফায়দা হবে। কিন্তু এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যাচ্ছে বাংলায় তিন দফায় যাতে ভোট হয়, সেবিষয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে সওয়াল করতে চলেছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ছাড়পত্রের উপরেই পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের জন্য কত সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী লাগবে সেই হিসাব নিকেশও প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। রাজ্যের স্পর্শকাতর বুথ চিহ্নিত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সাতটি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের নজরে রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে দুই ২৪ পরগনা, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, বীরভূম, মালদা ও মুর্শিদাবাদ।
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে এ রাজ্যে যত কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল তার চেয়েও এবার বেশি সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার ভাবনা রয়েছে কমিশনের। ইতিমধ্যে এ রাজ্যের সব স্পর্শকাতর বুথের তালিকা কমিশন তৈরি করে দিল্লিতে পাঠানোর জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। আসন্ন ভোট পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারেরও বেশ কয়েক দফায় বৈঠক হয়েছে। সব মিলিয়ে বঙ্গে ভোট প্রস্তুতি তুঙ্গে।
এবার এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ ভোটের নির্ঘণ্ট কেমন ছিল। এরাজ্যের জন্য ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোট ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন। নিয়ম অনুযায়ী ভোট ঘোষণার পর ৩০–৪৫ দিনের মধ্যে ভোট প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। যেদিনই নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ হয় সেদিন থেকেই গোটা রাজ্য চলে যায় নির্বাচন কমিশনের হাতে। সেদিন থেকে চালু হয়ে যায় নির্বাচনী আচরণবিধি।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে রুখতে বিজেপি একাধিক দফায় ভোট চেয়েছিল। পরে দেখা যায়, সে বার রাজ্যে ৮ দফায় ভোট হয়। প্রথম দফার ভোট হয়েছিল ২৭ মার্চ আর শেষ দফা হয়েছিল ২৯ এপ্রিল। ভোট গণনা হয়েছিল ২ মে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪টি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১৪৮টি আসন পেতে হবে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৭৭টি আসনে জয়ী হয়। ২০০–র বেশি আসন যায় তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে।
এবার নির্বাচনের ফলাফল কী হয় সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন রাজ্যবাসী। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যত দফাতেই ভোট হোক না কেন, তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে বিজেপিও টক্কর দিতে মরিয়া। বাম–কংগ্রেসও শূন্যের গেরো কাটিয়ে আশানুরূপ ফল করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, উন্নয়ন ও প্রচারের নিরিখে রাজ্যবাসীর মন জয় করতে পেরেছে শাসকদল। এর ফায়দা দলের নেতানেত্রীরা আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন (সম্ভাব্য নির্ঘণ্ট) (১৫–৩০ এপ্রিলের মধ্যে)
প্রথম দফা– উত্তরবঙ্গের ৮ জেলা
দ্বিতীয় দফা– কলকাতা, হাওড়া, দুই ২৪ পরগনা, হুগলি ও নদিয়া
তৃতীয় দফা– পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ
২০২১ পশ্চিবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন
প্রথম দফা– ২৭ মার্চ
দ্বিতীয় দফা– ১ এপ্রিল
তৃতীয় দফা– ৬ এপ্রিল
চতুর্থ দফা– ১০ এপ্রিল
পঞ্চম দফা–– ১৭ এপ্রিল
ষষ্ঠ দফা– ২২ এপ্রিল
সপ্তম দফা– ২৬ এপ্রিল
অষ্টম দফা– ২৯ এপ্রিল
ভোট গণনা– ২ মে
Advertisement