• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 31 July, 2026

২১শে জুলাই ১৩ শহিদের জীবনদান ব্যর্থ হয়নি

স্নেহাশিস চক্রবর্তী, পরিবহণমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রতিবছর ২১ জুলাই, উত্তাল জনসমাগমের সাক্ষী এই শহর কলকাতা৷ শুধু তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী নয়, বাংলার আপামর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের আবেগ মিশে থাকে ২১শে জুলাইয়ের শহিদ স্মরণসভাকে ঘিরে৷ সেই আন্দোলনই গণ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়, যা আমজনতার স্বার্থে পরিচালিত হয়৷ আবার সেই গণ আন্দোলনের রেশ যুগের পর যুগ সমাজে অণুরণন সৃষ্টি করতে পারে,

২১শে জুলাই ১৩ শহিদের জীবনদান ব্যর্থ হয়নি

স্নেহাশিস চক্রবর্তী, পরিবহণমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার

প্রতিবছর ২১ জুলাই, উত্তাল জনসমাগমের সাক্ষী এই শহর কলকাতা৷ শুধু তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী নয়, বাংলার আপামর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের আবেগ মিশে থাকে ২১শে জুলাইয়ের শহিদ স্মরণসভাকে ঘিরে৷ সেই আন্দোলনই গণ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়, যা আমজনতার স্বার্থে পরিচালিত হয়৷ আবার সেই গণ আন্দোলনের রেশ যুগের পর যুগ সমাজে অণুরণন সৃষ্টি করতে পারে, যার ফল সামাজিক কোনও মৌলিক পরিবর্তনের সহায়ক হয়৷ আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক দেশ৷ স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের সংবিধান রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে এই নীতিকেই গ্রহণ করেছিল৷ সাধারণ মানুষই থাকবে সরকার গঠনের নির্ণায়ক শক্তি৷ ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও কতগুলি দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল৷ কিন্ত্ত ওই সকল দেশের কর্ণধাররা মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার কথা ভাবেনি৷ ফলে ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আয়ুব খান বন্দুকের নল দেখিয়ে পাকিস্তান দখল করে নিয়েছিলেন৷ সামরিক অভু্যত্থান ঘটল পাকিস্তানে৷

১৯৬২ সালে ইন্দোনেশিয়ায় মিলিটারির বুটের তলায় মানুষের মৌলিক অধিকার বিসর্জিত হল৷ তারপর একে একে শ্রীলঙ্কা, ব্রহ্মদেশ, আফগনিস্তান এমনকি ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশেও গণতন্ত্র টেকেনি৷ কিন্ত্ত একমাত্র ভারতবর্ষে কিছু কিছু দুর্বলতা নিয়েও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতবর্ষ এটা আমাদের আত্মশ্লাঘা৷ তবুও আমাদের দেশে কখনও কখনও কোথাও কোথাও বাক্স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকারগুলি ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঘটনা ঘটে৷ সাধারণ মানুষকে লড়তে হয় এগুলির বিরুদ্ধে৷

দীর্ঘ ৩৪ বছর বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন অবস্থায় একদলীয় শাসন ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপ অনুভব করেছে বাংলার মানুষ৷ একদিকে অনুন্নয়ন আর একদিকে সিপিএমের অত্যাচার বিরোধী মতাবলম্বী মানুষের ওপর অতিষ্ঠ করে তুলেছিল বাংলার মানুষকে৷ কিন্ত্ত প্রতিটি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে ক্ষমতায় চলে আসার কৌশল সিপিএম শিল্পে পরিণত করেছিল৷ বিরোধী দল হিসেবে কংগ্রেস নেতৃত্বের গা বাঁচিয়ে চলার নীতি, কোথাও আবার সিপিএমের সঙ্গে বোঝাপড়া নীতিতে বিচারের পথ খুঁজে পাচ্ছিল না বাংলার মানুষ৷ কংগ্রেস রাজনীতির সেই ভঙ্গুর ভূমি থেকে জ্বলন্ত লাভা উদগিরণের মতো ছিটকে বেরিয়ে এলেন এক নেত্রী৷ অসহায়, অত্যাচারিত মানুষের সহায়সম্বল হয়ে দাঁড়ালেন— তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ পথ খুঁজে বের করলেন কীভবে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়৷ অচিরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আন্দোলন সমার্থক হয়ে উঠল৷ যেখানেই মানুষ অত্যাচারিত, সেখানেই ছুটে গেলেন তিনি৷ বুঝতে অসুবিধা হল না, তাঁর বামফ্রন্টের ভোটে জেতার কৌশল৷ শুধু বাংলা নয়, আরও কিছু প্রতিবেশী রাজ্যেও ভোট পরিণত হয় প্রহসনে৷ তিনি দাবি করলেন, প্রতিটি ভোটারের হাতে একটি সচিত্র পরিচয়পত্র থাকা আবশ্যক৷ একজনের ভোট আর একজন দিয়ে দেওয়ার কৌশল ব্যর্থ হবে তাতেই৷

১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই মহাকরণের চারপাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে জমা হলেন লাখো লাখো মানুষ৷ মহাকরণের ভেতরে তখন নির্বাচন কমিশনের অফিস৷ সচিত্র পরিচয়পত্রের দাবিতে, এক শান্তিপূর্ণ জমায়েত৷ ভারতবর্ষের গণতন্ত্রকে মজবুত করার সেটা ছিল ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ৷ মহাকরণের ভেতরে সেইদিন ছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু৷ শান্তিপূর্ণ সেই জমায়েতগুলিতে সেই সময় চলছিল নেতৃত্বের বক্তৃতা৷ কর্মীদের হাতে ছিল দলীয় পতাকা৷ বামফ্রন্টের পুলিশের গুলি চলল সেই শান্ত, নিরীহ জমায়েতের উপর৷ পুলিশি অত্যাচার নেমে এল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরও৷ কতজন তরতাজা যুবক সেদিন প্রাণ হারালেন পুলিশের গুলিতে৷ এ ইতিহাস আমরা সকলেই জানি৷ ১৩ জন শহিদের রক্ত মিশেছিল কলকাতার মাটিতে৷ গঙ্গা নদীর জল চুয়ে সেই রক্ত পৌঁছলো সমগ্র বাংলায়৷ জন্ম দিল হাজার হাজার মিছিলের৷

সেই ১৩ জন শহিদের জীবন দেওয়া ব্যর্থ হয়নি৷ সেই আন্দোলনের জেরেই সারা ভারতবর্ষের ভোটাররা পেল সচিত্র পরিচয়পত্র৷ ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত করার প্রাথমিক সোপান হিসেবে ২১ জুলাই দিনটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে৷ তাই প্রতিবছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়ে কলকাতায় ২১শে জুলাইয়ের শহিদ স্মরণসভায়৷

১৩ জন শহিদের জীবন দেওয়া ব্যর্থ হয়নি, কারণ বাংলা আজ সিপিএম মুক্ত৷ কথা বলার অধিকার পেয়েছে বাংলার মানুষ৷ ১৩ জন শহিদের জীবন দেওয়া ব্যর্থ হয়নি, কারণ আজ বাংলার সর্বস্তরের, সর্বশ্রেমির মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে উন্নয়নের ফসল৷ বাংলা আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে৷ একদিকে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন ঘটেছে, তেমনই আর একদিকে অজস্র সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকতে গেলে যেসব প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা (প্রাইমারি নিডস) লাগে, তা পূরণ করছে আমাদের সরকার৷

তিনটি কারণে ভারতবর্ষের যে কোনও সরকারের থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার স্বতন্ত্রতা দাবি করতে পারে৷ এক, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা— দিদি ২০১১ সালের নির্বাচনের আগে দলগতভবে ইস্তেহার আকারে যেসকল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সবকটি বাস্তবে রূপ পেয়েছে৷ ২০১৬ ও ২০২১-এর আগে দিদি যা বলেছিলেন, সবগুলিই তিনি রূপায়িত করেছেন৷

দুই, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলিকে সার্বজনীন করা— বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সকলের দিদি যাকিছু করেন, সকলের জন্য করেন৷ মুখ দেখে কাউকে পাইয়ে দেওয়াও যায় না৷ কিংবা বঞ্চিত করাও যায় না৷ সরকারি প্রকল্প জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি নির্বিশেষে সবার জন্য৷
তিন, প্রকল্পের সুবিধা যাতে প্রতিটি মানুষ পায়, যেন কেউ বঞ্চিত না থাকে, তা ‘দুয়ারে সরকার’-এর মতো একটি অভিনব সরকারি কর্মসূচি দ্বারা নিশ্চিত করা হচ্ছে৷ বিভিন্ন জাতি, উপজাতি, জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান তাই উন্নত হচ্ছে৷

আজও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমানভাবে লড়াই চালাচ্ছেন এক অন্য আঙ্গিকে৷ আজ দিদির লড়াই সমাজ থেকে দারিদ্রতা-অপুষ্টি দূর করার লড়াই৷ লড়াই অশিক্ষা দূর করা, চিকিৎসাহীনতা দূর করা৷ তাই ১৩ জন শহিদের জীবন দেওয়া ব্যর্থ হয়নি৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্য নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বহু উন্নয়ন প্রকল্প জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে৷ উন্নয়নের সাথে যুক্ত করতে পেরেছেন বাংলার আমজনতাকে৷ তাই প্রতিটি নির্বাচনে দিদির প্রতি জনসমর্থন বাড়ছে ক্রমশ৷ আজ প্রমামিত হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু এক আন্দোলনের নেত্রী নন, তিনি দক্ষ প্রকাশকও বটে৷

যতদিন ভারতে গণতন্ত্র থাকবে, ততদিন ২১শে জুলাইয়ের জীবনদানের কথা স্মরণ করবে মানুষ৷