• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 8 November, 2026

আমেরিকা ও ইজরায়েলের বন্ধুত্বের সমীকরণ কি বদলের পথে?

ইজরায়েলের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে রয়েছে পুরনো নীতিতে অনড় থেকে আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সাময়িক ঘটনা বলে উপেক্ষা করা; অন্যদিকে রয়েছে বাস্তবতা মেনে কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন করে সাজানো। দ্বিতীয় পথটিই সম্ভবত বেশি বিচক্ষণতার। কারণ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি শুধু ইজরায়েলের সামরিক নিরাপত্তাকে নয়, মধ্যপ্রাচ্যে তার সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করতে পারে।

আমেরিকা ও ইজরায়েলের বন্ধুত্বের সমীকরণ কি বদলের পথে?

Photo: Pexels

আমেরিকা ও ইজরায়েলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বিশেষ অধ্যায়। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতিতে ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা ওয়াশিংটন। সামরিক সাহায্য, অস্ত্র সরবরাহ, কূটনৈতিক সমর্থন, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো— প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই আমেরিকা ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের এই সম্পর্ক শুধু কৌশলগত স্বার্থের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, রাজনীতি, অভিন্ন নিরাপত্তাবোধ এবং দীর্ঘদিনের পারস্পরিক নির্ভরতা। কিন্তু সাম্প্রতিক মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ইজরায়েলের রাজনৈতিক মহলে এখন আশঙ্কা, আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের চেনা সমীকরণ হয়তো দ্রুত বদলে যেতে চলেছে।

এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইজরায়েল প্রশ্নটি কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একসময় ইজরায়েলের প্রতি সমর্থন ছিল মার্কিন রাজনীতির প্রায় সর্বদলীয় ঐকমত্যের বিষয়। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট— দুই দলের নেতারাই ইজরায়েলের নিরাপত্তাকে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতেন। মতপার্থক্য থাকলেও ইজরায়েলকে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নে বড় ধরনের বিভাজন দেখা যেত না। কিন্তু গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, লেবাননে সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলি আমেরিকার জনমতকে ক্রমশ বদলে দিয়েছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইজরায়েল সরকারের নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ বেড়েছে। মানবাধিকার, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন এখন মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিরও অংশ।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, এই অসন্তোষ আর শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রিপাবলিকান শিবিরের মধ্যেও ইজরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন করার নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের বক্তব্যে সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি যখন ভোটারদের দলত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে ইজরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন, তখন বোঝা যায়, বিষয়টি আর নিছক বিদেশনীতি নয়; এটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবনিকাশেরও অংশ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ ইজরায়েলকে সমর্থন করা এখন আমেরিকার কোনও কোনও রাজনৈতিক নেতার কাছে নির্বাচনী ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির জন্য ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে সে দেশের বিরোধীরা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ককে দ্বিদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিচালনা না করে রিপাবলিকান দলের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ করে তুলেছেন।

২০১৫ সালে মার্কিন কংগ্রেসে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অবস্থানের বিরোধিতা করে নেতানিয়াহুর ভাষণ ছিল এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি কার্যত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পাশ কাটিয়ে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের সমর্থন চেয়েছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে এই পদক্ষেপ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করলেও দীর্ঘমেয়াদে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্কের ভিত দুর্বল করেছে বলে অনেকের ধারণা।

নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ইজরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ যে সব সময় এক নয়, বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। কোনও একটি মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কখনওই দুই দেশের স্থায়ী সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না। আমেরিকায় ক্ষমতার পরিবর্তন হয়, প্রেসিডেন্ট বদলান, কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যায়। ফলে ইজরায়েলের মতো একটি রাষ্ট্রের পক্ষে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই কূটনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করার মূল্য এখন ইজরায়েলকে দিতে হতে পারে।

মার্কিন সামরিক সাহায্য বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার গুরুত্বও কম নয়। যদিও আমেরিকার বার্ষিক সামরিক সাহায্য ইজরায়েলের মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের তুলনায় সীমিত, তবু তার কৌশলগত গুরুত্ব বিপুল। ইজরায়েলের বিমানবাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধবিমান মার্কিন প্রযুক্তি ও সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। আধুনিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যন্ত্রাংশ এবং সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আমেরিকার সহযোগিতা অপরিহার্য। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত ইজরায়েলকে আরও একবার বুঝিয়ে দিয়েছে, উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে এককভাবে সামরিক ক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন।

অতএব, সাহায্যের পরিমাণ কমে যাওয়ার চেয়েও বড় আশঙ্কা হল, অস্ত্র সরবরাহ ও যৌথ সামরিক প্রকল্পের অনুমোদন যদি রাজনৈতিক কারণে বিলম্বিত হয়, তাহলে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় তার প্রভাব পড়বে। মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লে অস্ত্র বিক্রি, সামরিক সহযোগিতা এবং যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে আরও কঠোর শর্ত আরোপের দাবি উঠতে পারে। শুধু অর্থ নয়, কূটনৈতিক সমর্থনের ক্ষেত্রেও ইজরায়েলকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

বিশেষত রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার ভেটো ইজরায়েলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে এক গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। আন্তর্জাতিক মহলে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান বা পশ্চিম তীরের নীতি নিয়ে সমালোচনামূলক প্রস্তাব উঠলে ওয়াশিংটনের সমর্থন অনেক ক্ষেত্রেই সেই চাপকে প্রতিহত করেছে। ভবিষ্যতে আমেরিকা যদি এই অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন আনে, তবে ইজরায়েলের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়তে পারে। গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযান, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মতো বিষয়ে ওয়াশিংটন আরও স্পষ্টভাবে সংযমের দাবি জানাতে পারে।

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সম্পর্ক একদিনে তৈরি হয়নি এবং কোনও একটি নির্বাচনের ফলেই তা ভেঙে পড়বে না। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব মোকাবিলা, গোয়েন্দা তথ্যের আদানপ্রদান, সামরিক প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ এখনও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বও জানে, ইজরায়েলের নিরাপত্তা প্রশ্নে সম্পূর্ণ অবস্থান পরিবর্তন করা সহজ নয়। ফলে সম্পর্কের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেই তার শর্ত ও পরিচালন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনও পক্ষ স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট আমেরিকার সঙ্গে দ্বিদলীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইয়াইর লাপিদের বক্তব্যেও সেই পুরনো কূটনৈতিক নীতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান রয়েছে— আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইজরায়েল কোনও পক্ষ বেছে নেবে না, বরং দুই দলের সঙ্গেই কাজ করবে। এই অবস্থান শুধু বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশল নয়, ইজরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে, এই পরিস্থিতি থেকে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখনও ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের উপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান, আস্থা এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া বাস্তবতাকে বোঝার ক্ষমতা। নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাকে ইজরায়েলের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছে, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলেই আমেরিকার সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামগ্রিক সমর্থন নিশ্চিত হয় না।

ইজরায়েলের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে রয়েছে পুরনো নীতিতে অনড় থেকে আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সাময়িক ঘটনা বলে উপেক্ষা করা; অন্যদিকে রয়েছে বাস্তবতা মেনে কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন করে সাজানো। দ্বিতীয় পথটিই সম্ভবত বেশি বিচক্ষণতার। কারণ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি শুধু ইজরায়েলের সামরিক নিরাপত্তাকে নয়, মধ্যপ্রাচ্যে তার সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করতে পারে।

নেতানিয়াহুর নীরবতা তাই কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়াহীনতা নয়, বরং ইজরায়েলের সামনে উপস্থিত এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের প্রতীক। এতদিন যে বন্ধুত্বকে ইজরায়েল প্রায় অবিচল ও চিরস্থায়ী বলে ধরে নিয়েছিল, এখন তাকে নতুন করে অর্জন করতে হবে। আর সেই অর্জনের শর্ত হবে শুধু আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক নয়, মার্কিন জনগণের আস্থা এবং দুই দলের সমর্থন পুনরুদ্ধার করা।