আমেরিকার রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন বরাবরই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের পর প্রশ্ন উঠছে, ডেমোক্র্যাটদের এই জয় কি ভারতের জন্য সত্যিই সুখবর? ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে গত কয়েক মাসে ভারতের যে বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তার অবসানের কোনও সম্ভাবনা কি দেখা যাচ্ছে? নাকি আমেরিকার রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এলেও ভারতের জন্য পরিস্থিতি খুব একটা বদলাবে না?
প্রথমেই বুঝতে হবে, আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোনও একটি দলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় নয়। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের কৌশলগত স্বার্থ, বাণিজ্যিক নির্ভরতা এবং এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা— এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারত ও আমেরিকার পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে। ফলে হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট থাকুন অথবা কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হোক, এই মৌলিক সম্পর্ক একেবারে বদলে যাওয়ার
সম্ভাবনা কম।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তি কমে যাওয়ায় ভারতের দর-কষাকষির সুযোগ কিছুটা বাড়তে পারে।
ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় এখন বাণিজ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অস্বস্তিকর অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় পণ্যের ওপর বিপুল শুল্ক আরোপের হুমকি এবং রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনার প্রশ্নে ওয়াশিংটনের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি বাণিজ্যিক কাঠামো নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। সেই অনুযায়ী ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করার কথা ছিল। বিনিময়ে আমেরিকার শিল্পপণ্য এবং কিছু কৃষিপণ্যের জন্য ভারতীয় বাজারে শুল্কছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়, পরবর্তী শুল্কব্যবস্থার পরিবর্তন এবং দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত।
এখানেই ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে আসায় তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন। শুল্কের ফলে মার্কিন বাজারে পণ্যের দাম কতটা বাড়ছে, আমেরিকার শিল্প ও ভোক্তারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সে বিষয়ে শুনানি হতে পারে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, ডেমোক্র্যাটরা সবাই অবাধ বাণিজ্যের সমর্থক নন। আমেরিকার শিল্প ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে তাঁদেরও সংরক্ষণবাদী মনোভাব রয়েছে। তাই ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক কমে যাওয়া নয়।
ভারতের জন্য আরও বড় উদ্বেগের জায়গা জ্বালানি। রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল কেনা ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা এই বাণিজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। অন্যদিকে, ইরানকে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা আন্তর্জাতিক তেলের বাজারকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব সরাসরি ভারতের অর্থনীতিতে পড়ে। পরিবহণ খরচ বাড়ে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত তার বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
ডেমোক্র্যাটরা রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করে আসছেন। ফলে রুশ তেল কেনার প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান ভারতের পক্ষে খুব স্বস্তিদায়ক হবে, এমন আশা করা যায় না। বরং কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভারতের জ্বালানি আমদানি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ওপর আরও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া দরকার। কোনও একটি দেশের রাজনৈতিক পছন্দের ভিত্তিতে নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা বিচার করেই তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাদারদের কাছে আমেরিকার এইচ-১বি ভিসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কাজ করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে এক লক্ষ ডলারের ফি আরোপের সিদ্ধান্ত ভারতীয় কর্মী ও তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই নীতির বিরুদ্ধে আলোচনা ও নজরদারির সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার কারণে কংগ্রেসের পক্ষে সরাসরি এই সিদ্ধান্ত বাতিল করা সহজ নয়। তা ছাড়া নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। তার আগে পরিস্থিতি বদলানোর
সম্ভাবনা সীমিত।
অতএব, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উচিত শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে না থেকে বিকল্প বাজার তৈরি, দক্ষ কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং দেশীয় প্রযুক্তি পরিকাঠামো শক্তিশালী করার দিকে
মনোযোগ দেওয়া।
বাণিজ্য ও ভিসা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকা সহযোগিতা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কোয়াডের মাধ্যমে দুই দেশ জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক মহড়া, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা— সব ক্ষেত্রেই এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ফলে এই সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। বিশেষ করে চিনের প্রভাব মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্য বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল। তবে ভারতের কাছে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেন তার স্বাধীন বিদেশনীতি পরিচালনার ক্ষমতাকে সীমিত না করে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব ভারতীয় শেয়ার বাজারেও পড়েছে। নির্বাচনের আগে ভারতীয় বাজারে যে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তা এখন ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসে ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিকদের উপস্থিতিও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। রো খান্না, প্রমীলা জয়পাল ও সুহাস সুব্রহ্মণিয়ামের মতো প্রতিনিধিদের জয় ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রভাবের পরিচায়ক। যদিও তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান ও অগ্রাধিকার এক নয়, তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের নানা বিষয়ে তাঁরা আলোচনার পরিসর তৈরি করতে পারেন। সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় ভারতের জন্য একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তিনি কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে ভেটো দিতে পারেন। আবার কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন ছাড়া সেই ভেটো অতিক্রম করাও সম্ভব নয়। অর্থাৎ, ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তাঁরা এককভাবে আমেরিকার বিদেশনীতি বা বাণিজ্যনীতি বদলে দিতে পারবেন না।
ভারতের কূটনীতির সামনে এখন প্রধান কাজ হল এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজে লাগানো। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি— প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভারতের বিদেশনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে দেওয়া উচিত নয়। ওয়াশিংটনে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, ভারতের লক্ষ্য হওয়া দরকার নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা। ডেমোক্র্যাটদের জয় তাই ভারতের জন্য কোনও নিশ্চিত সুসংবাদ নয়, বরং নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার একটি সুযোগ। সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে ভারতের নিজস্ব রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর।




